অর্থ পাচার ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের কৌশল ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
প্রকাশিত:
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৮
আপডেট:
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:১২
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) এবং সাইবার অপরাধ দুটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের ফলে জাতীয় রিজার্ভ হ্রাস, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
একইভাবে, সাইবার অপরাধের দ্রুত বিস্তার হয়েছে যেমন অনলাইন প্রতারণা, ডেটা চুরি এবং ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারে আক্রমণ যার মধ্যে আছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে) ক্ষমতায় আসার পর এই দুটি ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার শুরু করে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এখন দুর্নীতি ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অর্থ পাচারের প্রেক্ষাপট ও বিপুল ক্ষতির চিত্র
বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) এবং অন্যান্য সূত্র অনুসারে, প্রতিবছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ডলারের মতো অর্থ পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার (প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে।
ওভার-ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং, হুন্ডি/হাওলা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির মাধ্যমে এই পাচার ঘটেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছিল এবং খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই অর্থ পাচারকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে-বিদেশে মোট ৬৬,১৪৬ কোটি টাকার (৬৬১ বিলিয়ন) সম্পদ ফ্রিজ/অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ৫৫,৬৩৮ কোটি এবং বিদেশে ১০,৫০৮ কোটি টাকার সম্পদ।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-তে সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বিলিয়নিয়ার মুহাম্মদ আজিজ খানের (সামিট গ্রুপ) ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ ফ্রিজ করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক মন্ত্রী-এমপি, ব্যবসায়ী ও আমলাদের বিপুল সম্পদ চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থ পাচার প্রতিরোধে নতুন সরকারের কৌশল
সরকারের প্রধান কৌশল হলো আইনি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ। অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অর্থ পাচার প্রতিরোধে আইনি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কে শক্তিশালী করা হয়েছে।
আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে নয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। বিদেশি সরকার ও সংস্থার সহায়তায় পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে যাতে পাচারকৃত অর্থ দ্রুত ফেরত আনা যায়। একটি ডেডিকেটেড অ্যাসেট রিকভারি এজেন্সি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া আয়কর আইনে বিদেশি অঘোষিত সম্পদের জরিমানার বিধান যোগ করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় ও দুর্বল ব্যাংকের মূলধন পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইএমএফ-এর পরামর্শ অনুসারে পাচার রোধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হচ্ছে। ২০২৫-২০২৮ সালের জন্য নতুন জাতীয় কৌশলপত্র (ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ফাইন্যান্স অব টেররিজম) অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ এবং ‘পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারেক রহমান বারবার বলেছেন, ‘যারা দেশের সম্পদ লুট করেছে, তাদের এক টাকাও ছাড় দেওয়া হবে না।’
নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচিতে অর্থ পাচার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি এবং উদ্ধারকৃত অর্থ জনকল্যাণে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
সাইবার অপরাধ: নতুন হুমকি
২০২৫ সালে একাই বাংলাদেশের উপর ৬ কোটি ৩০ লাখ সাইবার আক্রমণ হয়েছে। আর্থিক খাতে প্রতিদিন ৬০০-এর বেশি আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ফিশিং, ডিপফেক, ডেটা ব্রিচ ও ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার হামলা বেড়েছে। সরকার মে ২০২৫-এ সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ বাতিল করে।
নিপীড়নমূলক ধারা (২১, ২৪-২৯, ৩১) বাতিল এবং হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) গঠন করা হয়েছে। ন্যাশনাল সাইবার অপারেশনস সেন্টার এবং বিজিডি ই-গভ সার্ট-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
অর্থ পাচার ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ভবিষ্যৎ রূপরেখা
ভবিষ্যতে অর্থ পাচার ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে একীভূত কৌশল দরকার। এই লড়াই সফল হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে এবং জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই হুমকি মোকাবিলা সম্ভব।
নতুন সরকারের জন্য নিম্নলিখিত তিনটি পরিকল্পনা হতে পারে—
(i) স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা: দ্রুত প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ
নতুন সরকারের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমানো এবং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কার্যকর করা।
(ক) আইন প্রয়োগের দক্ষতা বৃদ্ধি: বিদ্যমান অর্থ পাচার ও সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত দক্ষতা জরুরি। তদন্তকারী সংস্থার জন্য বিশেষায়িত সাইবার ফরেনসিক ইউনিট গঠন বা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর মধ্যে তথ্য বিনিময় আরও দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে।
(খ) সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ জোরদার: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের বা অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার জরুরি।
(গ) ডিজিটাল পেমেন্ট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিং নজরদারি: মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ওয়ালেটের বিস্তার অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ালেও অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই পরিচয় যাচাইকরণ (KYC) কঠোর করা এবং ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্তে ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা প্রয়োজন।
(ঘ) দ্রুত প্রতিক্রিয়া সেল: সাইবার প্রতারণা বা অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক তদন্তের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত রেসপন্স সেন্টার থাকা দরকার।
(ঙ) জনসচেতনতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা: অনেক ক্ষেত্রে সাইবার অপরাধ সফল হয় ব্যবহারকারীর অজ্ঞতার কারণে। তাই গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক খাতের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।
(ii) মধ্যমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা কার্যকর হলেও দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।
(ক) সমন্বিত জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা নীতি: বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমের পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় নীতি কাঠামো প্রয়োজন । এতে আইন, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একীভূত হবে ।
(খ) বিশেষায়িত সাইবার আদালত: সাইবার অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রযুক্তিগতভাবে প্রশিক্ষিত বিচারক ও প্রসিকিউটরসহ বিশেষ আদালত গঠন জরুরি ।
(গ) ডেটা শেয়ারিং ফ্রেমওয়ার্ক: সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে নিরাপদ তথ্য বিনিময়ের জন্য আইনি কাঠামো প্রয়োজন, যাতে সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত হয় ।
(iii) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরোধ কাঠামো
অর্থ পাচার ও সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর।
(ক) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স: বড় পরিসরের লেনদেন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক প্যাটার্ন শনাক্তে AI-ভিত্তিক সিস্টেম অত্যন্ত কার্যকর। এটি ভবিষ্যৎ অপরাধের ঝুঁকি পূর্বাভাসও দিতে পারে।
(খ) ব্লকচেইন বিশ্লেষণ সক্ষমতা: ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচার প্রতিরোধে ব্লকচেইন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা গড়ে তোলা জরুরি।
(গ) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা: অর্থ পাচার সাধারণত সীমান্ত অতিক্রম করে। তাই তথ্য বিনিময় চুক্তি, যৌথ তদন্ত এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ অপরিহার্য।
(ঘ) মানবসম্পদ উন্নয়ন: সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিশ্লেষক এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তৈরিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
উপসংহার
অন্তর্বর্তী সরকার অর্থ পাচার ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় যে ভিত্তি স্থাপন করেছে, তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের জন্য অপরিহার্য। তবে এই লড়াইয়ের সাফল্য নির্ভর করবে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনগণের সচেতনতার ওপর।
সফল হলে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে একটি দুর্নীতিমুক্ত, সুরক্ষিত ডিজিটাল অর্থনীতির মডেল হতে পারবে। যদি স্বল্পমেয়াদি প্রতিরোধ ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে বাংলাদেশ এক শক্তিশালী, নিরাপদ এবং স্বচ্ছ ডিজিটাল অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
ড. মো. আশরাফুল ইসলাম : সহযোগী অধ্যাপক, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: