শনিবার, ৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৫শে মাঘ ১৪৩২


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : বিশুদ্ধ বাতাস কি অগ্রাধিকার পাবে?


প্রকাশিত:
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৪

আপডেট:
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:১০

ছবি : সংগৃহীত

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসছে। উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প, প্রবৃদ্ধি, স্মার্ট বাংলাদেশের মতো সব শব্দই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে, এই উন্নয়ন কি মানুষের নিরাপদ শ্বাস নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে? যদি না করে, তবে সেই উন্নয়ন কার জন্য?

বাংলাদেশ আজ এমন এক কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বায়ু দূষণ নীরবে কিন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে মানুষ হত্যা করেই চলেছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোয় বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এমন বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির নির্ধারিত মানমাত্রা বহু আগেই অতিক্রম করেছে।

তবুও আশ্চর্যজনকভাবে, বায়ু দূষণ এখনো নির্বাচনী রাজনীতির প্রান্তিক ইস্যু। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে বিশুদ্ধ বাতাস দিতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? প্রায়শই আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় যে, বায়ু দূষণের দায় কার? দায় সবার কিন্তু দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের।

বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটা চলছে, পুরোনো ধোঁয়াবাহী যানবাহন রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, শিল্পকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া আকাশ ঢেকে ফেলছে, আর নির্মাণকাজের ধুলা শহরকে ধূসর করে তুলছে। আইন আছে, নীতিমালা আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় কেউ কি নেবে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো এই সুযোগ খুব ভালোভাবেই কাজে লাগাতে পারে। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো কি সত্যিই এই সুযোগ নিতে চায়, নাকি বায়ু দূষণের মতো ‘অকাট্য সত্য’ কে আবারও ইশতেহারের বাইরে রেখে দেবে?

জনগণের কাছে আজ পরিষ্কার যে, বায়ু দূষণ আর পরিবেশবাদীদের একক ইস্যু নয়, এটি এখন ভোটারের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। একজন রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক, দিনমজুরের মতো একজন স্কুলপড়ুয়া শিশুশিক্ষার্থী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাসহ সবার ফুসফুসই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ নির্বাচনী প্রচারণার বক্তৃতায় এই মানুষগুলোর নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া নিশ্চিত করার কথা খুব কমই শোনা যায়।

বায়ু দূষণকে বাংলাদেশে এখনো একটি ‘পরিবেশগত সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়। এটি একটি মারাত্মক নীতিগত ভুল। বাস্তবে বায়ু দূষণ হলো জনস্বাস্থ্য সংকট, অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার সম্মিলিত প্রকাশ। এই সংকটকে ইশতেহারে না আনা মানে সমস্যাকে অস্বীকার করা, আর অস্বীকারই রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রথম ধাপ।

বায়ু দূষণ সরাসরি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন রক্ষার দায় বহন করে। কিন্তু যখন রাষ্ট্র জানে যে দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ১.৮ বিলিয়ন শিশু দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বায়ু দূষণে প্রতিবছর ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মানুষ মারা যাচ্ছে, এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) অনুযায়ী, বায়ু দূষণ বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু থেকে গড়ে ৫.৫ বছর কমিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বায়ু দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তবুও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না, তখন সেটি আর প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকে না, তা নীতিগত অবহেলা হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনী ইশতেহারে এই ইস্যু উপেক্ষা করা মানে সেই অবহেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।

বায়ু দূষণ অর্থনীতির জন্য ‘অদৃশ্য কর’। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই বলেন, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করলে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। তবে বাস্তবতা পুরোটাই উল্টো। দূষিত বাতাসে অসুস্থ জনগোষ্ঠী কখনোই টেকসই অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে না। স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি ব্যয়, কর্মক্ষমতার ক্ষতি এবং অকাল মৃত্যু সব মিলিয়ে বায়ু দূষণ অর্থনীতির ওপর একটি অদৃশ্য বোঝা।

দূষণের বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না, এটি সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন। ধনী মানুষ এসি, পরিশোধিত বাতাস ও উন্নত চিকিৎসা পায়। কিন্তু রিকশাচালক, দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক, স্কুলগামী শিশুদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করা মানে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় বৈষম্য চাপিয়ে দেওয়া। একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনে এর চেয়ে রাজনৈতিক ইস্যু আর কী হতে পারে।

আবার, বাংলাদেশে পরিবেশ আইন, নীতিমালা ও আদালতের নির্দেশনার অভাব নেই। অভাব আছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার। ইটভাটা বন্ধের ঘোষণা আসে, তারপরও সব ঘোষণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবার চলে। পুরোনো যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়, কিন্তু রাস্তায় দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন নেই। এর মানে সমস্যা প্রযুক্তিগত নয়, সমস্যা শাসন ও জবাবদিহির।

তাই ইশতেহারে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয় উল্লেখ থাকলে সেখানে শুধু লক্ষ্য নয়, কারা দায় নেবে এবং কীভাবে জবাবদিহি হবে, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তাহলে তাদের ইশতেহারে থাকতে হবে, কখন কোন দূষণকারী খাত বন্ধ বা সংস্কার হবে, কোন সংস্থা দায়ী থাকবে, কীভাবে নাগরিকরা তথ্য জানবে ও প্রশ্ন তুলবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ এখন চাপে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs), পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বললেও নিজেদের শহরের বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সেই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নির্বাচন একদিনের, সরকার পাঁচ বছরের কিন্তু দূষিত বাতাস প্রতিদিনের এবং প্রাণঘাতী।

তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ থাকুক শুধু একটি অনুচ্ছেদ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার অগ্রাধিকার হিসেবে। কারণ বিশুদ্ধ বাতাস কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। আর যে রাজনীতি সেই অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না, ইতিহাস একদিন তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করবেই।

রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই উন্নয়নকে পরিবেশের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই যুক্তি শুধু ভুলই নয়, বিপজ্জনকও। যদি রাজনৈতিক দলগুলো সত্যিই জনবান্ধব হতে চায়, তাহলে তাদের ইশতেহারে স্পষ্টভাবে কিছু অতীব জরুরি বিষয় উল্লেখ থাকতে হবে যেমন ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ পাস ও বাস্তবায়ন, দূষণের প্রধান উৎসগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন বন্ধের সময়সূচি, ইটভাটা আধুনিকায়নের বাধ্যতামূলক রোডম্যাপ, শিল্প নির্গমনে শূন্য সহনশীলতা নীতি, জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির পরিকল্পনা, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি, গণপরিবহন ও নগর সবুজায়নে বাস্তব বিনিয়োগ, পরিবেশ ক্যাডার ও পরিবেশ পুলিশ নিয়োগ এবং আন্তঃদেশীয় বায়ু দূষণ সমাধানকল্পে পরিকল্পনা। এসব শুধু কাগুজে প্রতিশ্রুতি হলে চলবে না। জনগণ এবার জানতে চায় কে দায় নেবে, কে জবাব দেবে এবং কে বাস্তবায়ন করবে?

ভোটারদের প্রতি সরাসরি আহ্বান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীরব থাকবেন না। প্রার্থীদের জিজ্ঞেস করুন, আপনার ইশতেহারে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ কোথায়? আপনার পরিকল্পনায় আমার সন্তানের ফুসফুসের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? পাঁচ বছর পর আমরা কি আরও উন্নত সড়ক পাব, নাকি আরও বেশি হাসপাতালের লাইনে দাঁড়াব?

মনে রাখতে হবে, বায়ু দূষণ কোনো বিমূর্ত পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি আপনার পরিবারের স্বাস্থ্য, আপনার কর্মক্ষমতা এবং আপনার বেঁচে থাকার প্রশ্ন। ভোট মানে শুধু ক্ষমতা দেওয়া নয়; ভোট মানে দায়িত্ব নির্ধারণ করা। এই নির্বাচনে এমন কাউকে ভোট দিন, যিনি কেবল উন্নয়নের কথা বলেন না, বরং নির্মল বাতাসে মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকারকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেন।

আসুন আমরা আমাদের নেতাদের কাছে প্রতিশ্রুতি চাই সময়সীমাসহ, জবাবদিহিসহ। কারণ সরকার বদলাতে পারে, শ্লোগান বদলাতে পারে কিন্তু যদি বাতাস না বদলায়, তবে মানুষের ভাগ্য বদলাবে না। তাই ভাগ্য বদলাতে আমাদের সচেতন হতে হবে।

ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার : ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ; অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)


সম্পর্কিত বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:




রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected]; [email protected]
সম্পাদক : লিটন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top