শনিবার, ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২রা ফাল্গুন ১৪৩২


যুদ্ধদিনে ফাগুনের ফুল


প্রকাশিত:
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৩

আপডেট:
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৬

ছবি : সংগৃহীত

অনেক আগে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, নাম ভুলে গেছি। কিন্তু একটা দৃশ্য মনে বা স্মৃতিতে লেগে আছে। অগ্রসরমান একটা ট্যাঙ্কের সামনে একটা মেয়ে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটির দুটি দিক, প্রথমত, মেয়েটির জন্য ভয়ে শরীর মন কেঁপে ওঠে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের ময়দানেও ফোটে ফুল প্রেমের, ভালোবাসা অথবা অযথা যুদ্ধহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের গান।

প্রেম ও যুদ্ধ একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে আসছে সেই অনাদিকাল থেকে। পরস্পর বিরোধিতাই যেন সুখ। যেমন ধরুন, পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে চাষ হয় গাজার, বিপরীতে প্রায় সব দেশে জন্মে লাল গোলাপসহ কত বিচিত্র ধরনের ফুল। গুলি এবং প্রেমের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা এই ধরনেরই। মাঝে মাঝে পত্রিকায় খবর দেখি, স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে স্বামী খুন। ভিন্ন খবরও পাই, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন। যখন কেঁচো খুঁড়তে যাবেন, দেখবেন, খুনের পেছনে লুকিয়ে আছে সেই প্রেম।

প্রেম কিন্তু আবার ধনী, গরিব, বংশ মর্যাদা সবসময়ে মানে না বা মেনেও চলে না। উদাহরণ হিসেবে সামনে চলে আসে, ডি. এইচ. লরেন্স রচিত ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ উপন্যাস। এই উপন্যাসটা লেখা হয়েছে ১৯২৮ সালে। প্রায় একশো বছরের মুখে দাঁড়িয়েও কেন বিশ্বব্যাপী উপন্যাসটা বিখ্যাত হয়ে আছে?

ওই প্রেম, তাও অসম। অসম শব্দটাই প্রেমের দুনিয়ায় দারুণ উপভোগ্য। লর্ডের বৌ কনি’র সঙ্গে বাড়ির বনকর্মীর অলিভার মেররস এর প্রেম-শুনতে বা পড়তেই এক ধরনের কেমন কেমন লাগে। যতই ক্লাসিক বা মহাধ্রুপতি আপনি হোন—ওই ‘অসম প্রেম’টাই আপনাকে নিবিড়ে গভীরে খুব টানে। এই কারণে এত বছর পরও ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ এই উপন্যাস অনেক বুজুর্গ পাঠক বুদ্ধিজীবীর টেবিলে।

প্রেমের উল্টো উপাখ্যানে আমাদের সামনে চলে আসে বিশ্ববিখ্যাত আর একটি উপন্যাস, ‘ললিতা’। রুশ কথাসাহিত্যিক ভ্লাদিমির নাভকভের লেখা অসম বয়সীর নারী পুরুষের প্রেমের অনন্য উপাখ্যান উপন্যাস ‘ললিতা’ লেখেন গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে প্যারিসে। পরে ‘ললিতা’ বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বের নানা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

‘ললিতা’ প্রেমের উপাখ্যানটা সেই সময়ে বিতর্ক তৈরি করেছিল বিশ্বব্যাপী। ললিতা তেরো বছর বয়সের এক সুন্দরী কন্যা। পঞ্চান্ন বছরের প্রফেসর হুমবার্ট বাড়িতে আসে নতুন অতিথি হিসেবে থাকার জন্য। ললিতাকে ভালো লেগে যায় প্রফেসরের। কিন্তু ললিতার মাও ভালোবাসে হামবার্টকে...। ত্রিমুখী এক জটিল আবর্তে ঢুকে যায় ‘ললিতা’ উপন্যাসের নিষিদ্ধ লোবানের স্রোতে। দুনিয়া জুড়ে ‘ললিতা’ উপন্যাসের কারণই হচ্ছে—নিষিদ্ধ বা অসম সম্পর্ক।

বাংলা সাহিত্যেও নিষিদ্ধ প্রেমের অনেক উপাখ্যান রচনা করেছেন আমাদের লেখকেরা। বুদ্ধদেব বসুর বিখ্যাত উপন্যাস—‘রাত ভরে বৃষ্টি’। মালতি মুখোপাধ্যায় আর নয়নাংশুর দশ বারো বছরের জীবনে একদিন ঢুকে পরে জয়ন্ত নামের এক তরুণ। মালতির জীবনে জয়ন্ত না আসা পর্যন্ত মালতি জানতেই পারে না, নিত্যদিনের সীমাবদ্ধ সংসারের বাইরেও অবিরাম সুখ ও সুখের চুম্বন আছে! যখন জানা হয়ে যায়, তখন কেউ বলে সর্বনাশ, কেউ বলে মুক্তি, কেউ বলে আনন্দ!  প্রকৃত পক্ষে জীবনের নামতা একটি সরল রেখায় সবসময়ে চলে না, চলতে পারে না। কারণ মানুষের রয়েছে বিচিত্র ও বিপরীতমুখী প্রবৃত্তি।

এই ধারায় আরও উপন্যাসের নাম করা যায়—সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’। সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’। খেলারাম খেলে যা উপন্যাস নিয়ে বাংলাদেশের পাঠক মহলেও বিবিধ কথাবার্তা প্রচলিত আছে। না পড়েই অনেকে শুনে শুনে বলেছেন, ‘খেলারাম খেলে যা’ অশ্লীল উপন্যাস। কিন্তু পাঠ করলে বুঝতে পারবেন একজন লেখক কত দূরায়াত দৃষ্টিতে সমাজ দেশ ও মানুষ মানুষের ভূগোলকে দেখতে পান, তারই অবিশ্বাস্য প্লাটফরম সৈয়দ হকের এই উপন্যাস—‘খেলারাম খেলে যা’।

উপন্যাসে অশ্লীলতার দায়ের মূলে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আর সাতচল্লিশের দেশভাগের নৃশংস সময়ে ভাইয়ের বোন হারানোর মর্মান্তিক পটভূমিই মুখ্য। কিন্তু পাঠক বা মানুষের অভ্যন্তরীণ মনে খুব সূক্ষ্মভাবে সম্ভোগ বা রমণের বা নারীর শরীর বিস্তারের লোভনীয় উপাদানই প্রধান হয়ে ওঠে। প্রেম বা অনুরাগ কিংবা ভালোবাসার মধ্যে নিহিত কামই যখন আরাধ্য তখন আর কোনো সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয় না।

বসনিয়া হার্জেগোভিনার স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে বিশিষ্ট অভিনয় শিল্পী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির পরিচালনায় অনেক বছর আগে একটা ছবি দেখছিলাম, যতদূর মনে পড়ে ছবিটার নাম—‘দ্যা ব্লাড ল্যান্ড এন্ড হারমোনি’। সেই সিনেমায় একটি মেয়ে শত্রু কর্তৃক বন্দি হয়। কিন্তু দেখা হয়ে যায় প্রেমিক পুরুষের সঙ্গে শত্রুর ক্যাম্পে। প্রেমিক এখন শত্রু। দুজনে কথাও বলতে পারে না পরিস্থিতির কারণে। বন্দি প্রেমিকাকে ভোগ করার জন্য বড় নেতা রুমে ঢোকে, শত্রু বন্ধু সেই নেতাকে হত্যা করে প্রেমিকাকে রক্ষা করে। প্রেমিকা কৃতজ্ঞ প্রেমিকের প্রতি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যখন প্রেমিকার সময় আসে, পালিয়ে যাওয়ার-সে কিন্তু প্রেমিককে দূর নিয়ন্ত্রিত বোমায় হত্যা করে পালিয়ে যায়, মাতৃভূমির দিকে।

প্রেম বা ভালোবাসা কী নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে আটকে রাখা যায়? পরিবেশ ও পরিস্থিতির কাছে, মনোজাগতিক সার্বভৌম ইচ্ছে এবং অনিচ্ছার কাছে প্রেম অনুরাগ বিরহ নতুন নতুন পরিবেশে গ্রন্থিত হয়ে নতুন অবয়বে মানুষের কাছে ধরা দেয়।

আমরা যদি প্রাচীন ইতিহাসের প্রেমের প্রদীপ পুরুষ ভ্যালেন্টাইনকে সামনে আনি, তখন প্রেম এক পরিণত ধারণায় আমাদের সামনে কেবল উপস্থিত হয় না, নতুন এক উপলব্ধি ও আত্মত্যাগের মহিমা প্রতিষ্ঠিত করে। রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের ছিল বিশাল সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনী প্রতিপালনের জন্য বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিল সম্রাট। এতে সৈন্যরা ক্ষেপে যায় কিন্তু গোপনে বিয়ে করতে থাকে।

সেই বিয়ে করাতে যায় গির্জার যাজক ভ্যালেন্টাইন। কারণ তিনি মনে করতেন প্রেম বিয়ে ঈশ্বরের অনন্ত উপহার। সম্রাটের কানে ভ্যালেন্টাইনের বিয়ের খবর পৌঁছে। সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস বন্দি করেন ভ্যালেন্টাইনকে। কিন্তু ইতিমধ্যে তিনি জনগণের কাছে প্রেমের প্রদীপ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন এবং কারাগারে তরুণ যুগলেরা দেখা করতে আসতেন ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে—হাতে গোলাপ নিয়ে। তখন জানা যায় সম্রাট প্রেমের পুরুষ ভ্যালেন্টাইনের জনপ্রিয়তায় ক্ষিপ্ত হয়ে ফাঁসির আদেশ দেন। অনুমান করা হয়, মহান প্রেমের দার্শনিক ভ্যালেন্টাইনকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রেক্ষিতে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন বা ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

প্রেম এমন শক্তির প্রকাশ, যার হয়তো কোনো অস্ত্রশস্ত্র থাকে না, কিন্তু নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রবহমান অনুরাগের ধারায় মানববিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে আলোর ফুলকির গতিতে।

বাংলাদেশের নারী-পুরুষ বা প্রেমিক-প্রেমিকারা বিশ্বের অন্যান্য জাতিসূত্রের সঙ্গে একত্র হয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভালোবাসার দিন হিসেবে গ্রহণ করেছে স্বতঃস্ফূর্ত চেতনায়, পালন করছে হলুদ শাড়ি ও খোপায় গুঁজে ফুল বিগলিত আবেগের অসম্ভব পরাকাষ্ঠায়। সুতরাং প্রেম দেশকাল সীমানা পার হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে জীবনের প্রান্তে প্রান্তে, বিন্দুতে বিন্দুতে।

কবিতায় প্রেম ও যুদ্ধের বয়ান নিপুণ বৈভবে বহুমাত্রিকতায় লিখেছেন অনেকেই কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর এই কবিতা যুদ্ধ ও প্রেমের এক আমরণ গথিক রচনা করেছে। কবিতাটি দীর্ঘ। শেষের কয়েকটি চরণ তুলে ধরলাম—

‘আমাকে ভুল বুঝোনা। আমি জানি, বারুদ কত নিরপেক্ষ,
প্রাণ কত বিপন্ন।
কাল হয়তো আগুন জ্বলবে দারুণ, হত্যা হবে লেলিহান,
যেমন আগে, অনেকবার, আমাদের মাতৃভুমি এই পৃথিবীর
মৃত্তিকায়-
চাকার ঘূর্ণনের মতো পুনরাবৃত্ত।

তবু এও জানি ইতিহাস এক শৃঙ্খল, আর আমরা চাই মুক্তি,
আর মুক্তি আছে কোন পথে, বলো, চেষ্টাহীন মিলনে ছাড়া?
মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন, মানুষের সঙ্গে বিশ্বের-
যার প্রমাণ, যার প্রতীক আজ তোমরা।

নাজমা, শামসুদ্দিন, আর রাত্রির বুকে লুকিয়ে-থাকা যত প্রেমিক,
যারা ভোলোনি আমাদের সনাতন চুক্তি, সমুদ্র আর নক্ষত্রের সঙ্গে,
রচনা করেছো পরস্পরের বাহুর ভাঁজে আমাদের জন্য
এক স্বর্গের আভাস, অমরতায় কল্পনা :

আমি ভাবছি তোমাদের কথা আজকের দিনে, সারাক্ষণ-
সেই একটি মাত্র শিখা আমার অন্ধকারে, আমার চোখের সামনে
নিশান।
মনে হয় এই জগৎ-জোড়া দুর্গন্ধ আর অফুরান বিবমিষার বিরুদ্ধে
শুধু তোমরা আছো উত্তর, আর উদ্ধার।’

প্রেম আর যুদ্ধ এভাবেই হাত ধরাধরি করে রচনা করে অনাবিল সময়ের মোহগন্ধ আলিঙ্গন, আর অনুভবের অমরাবতী। মানব জমিনের চরণ চিহ্নে ফুটে উঠুক বারুদের পরিবর্তে গোলাপের পাপড়ি। চুম্বনে চুম্বনে যুদ্ধের ময়দান হয়ে যাক গোলাপ বাগান।

মনি হায়দার : কথাসাহিত্যিক


সম্পর্কিত বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:




রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected]; [email protected]
সম্পাদক : লিটন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top