শনিবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯ই ফাল্গুন ১৪৩২


সংযমের মাসে বাড়তি ব্যয়, হিমশিম খাচ্ছে নিম্নআয়ের পরিবার


প্রকাশিত:
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৮

আপডেট:
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:২০

ছবি : সংগৃহীত

রমজান সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হলেও অনেক নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এটি বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিয়ে আসে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে ইফতার সামগ্রীর চাহিদা বাড়ায় মাসিক খরচও বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষদের সংসারের হিসাব মেলাতে বাড়তি কষ্ট করতে হচ্ছে।

বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহকর্মী ও নিম্নবেতনভুক্ত চাকরিজীবীরা বলছেন, আয় অপরিবর্তিত থাকলেও রমজানে খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয় করা তো দূরের কথা, ধারদেনাও করতে হচ্ছে অনেককে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার, আগারগাঁও তালতলা বাজার, মিরপুর কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছোলা, বুট, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বেগুনি, পিঁয়াজু, আলুর চপ, হালিম ও অন্যান্য ইফতার সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। ভালো মানের এক হালি লেবুর দাম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। কিছু দোকানে বড় আকারের লেবু হালি ১৫০ টাকা দামেও বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ একটি লেবুর দামই পড়ছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও মাঝারি আকারের এক হালি লেবু ২০ থেকে ৪০ টাকায় পাওয়া যেত। গত বছর রোজার শুরুতেও এক হালি লেবুর দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে।

রমজানে ইফতারের টেবিলে লেবুর শরবত অনেকের কাছেই অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান দামে লেবু কেনা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোহাম্মদপুর বাজারে লেবুর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব কষছিলেন মোনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দুই দিন আগেও ৪০-৫০ টাকায় হালি লেবু পাওয়া গেছে, এখন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। বড় আকারের হলে ১৬০ টাকা পর্যন্ত চাইছে কেউ কেউ।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ কীভাবে এই দামে লেবু কিনবে? একটি লেবুর দামই যদি ৩০-৪০ টাকা হয়, তাহলে প্রতিদিন শরবত বানানো সম্ভব নয়। হঠাৎ করে বাজার থেকে লেবু উধাও হয়ে যাওয়ার পর দাম বেড়েছে। ফলন কমের কথা বলা হলেও প্রকৃত অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিক্রেতারা বলছেন, মৌসুম শেষ হওয়ায় লেবুর সরবরাহ কমেছে। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে।

অনেক বিক্রেতা দাবি করছেন, আগের বছরের তুলনায় দাম খুব বেশি বাড়েনি, তবুও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য প্রতিদিন বাড়তি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কৃষি মার্কেটের সবজি বিক্রেতা কামাল হোসেন জানান, আড়তে লেবুর দাম বেড়েছে, তাই খুচরায়ও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি দামের চেয়ে ১০-২০ টাকা লাভ রেখেই বিক্রি করতে হচ্ছে।

শুধু লেবু নয়, ইফতার তৈরির অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। বেগুন ও শসার দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বড় আকারের বেগুনের দাম আরও বেশি। শসা বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। টমেটো ও গাজরের দামও কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব সবজির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও স্বস্তি নেই। পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় উঠেছে। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এসব বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

আমিষের বাজারেও একই চিত্র। দুই সপ্তাহ আগে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল কেজিতে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। এখন তা ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেড়েছে। সোনালি মুরগির দামও বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা। সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়।

খামারিরা বলছেন, মুরগির বাচ্চার দাম বেড়েছে এবং শীতে মৃত্যুহার বাড়ায় উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি রোজা শুরুর আগে চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে।

মাছের বাজারেও দাম ঊর্ধ্বমুখী। চাষের তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদা, কই, শিং, রুই ও কাতলার দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ২০০-২২০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই বা কাতলা ৪০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য মাছ-মুরগির এই মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

ফলের বাজারেও চড়া দাম। রোজায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুর, মাল্টা ও আপেলের। গতকাল মাল্টা বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা, আর আপেল ৩৩০ থেকে ৪০০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগে এসব ফল ৫০-৮০ টাকা কম দামে পাওয়া যেত। দেশীয় ফলের মধ্যেও দাম বেড়েছে। কলার দাম ডজনে ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। পেঁপে, পেয়ারা ও বরই আগের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

তবে ফার্মের ডিমের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল। এক ডজন বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়। ফলে এক হালি লেবুর দামে এখন এক ডজন ডিম কেনা যাচ্ছে। এই তুলনাই বাজার পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক ক্রেতা।

কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, রোজার সময় যেসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে, প্রায় সব কটির দাম বেড়েছে। তার মতে, রমজান এলে যেখানে দাম কমার প্রত্যাশা থাকে, সেখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সীমিত বেতনে সংসার চালাতে গিয়ে এখন হিসাব মিলছে না।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কয়েক দিন ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে। যদিও ছোলা, অ্যাংকর ডাল ও চিনির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৩-৪ টাকা বেড়েছে সরবরাহ কমে যাওয়ায়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রমজান উপলক্ষে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সরবরাহ ও তদারকি যথাযথ না হলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বড় চাপ সৃষ্টি করে। আয় স্থির থাকলেও খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দেন।

নিম্নআয়ের অনেক পরিবার এখন বিকল্প খুঁজছে। কেউ লেবুর বদলে কাঁচা আমের শরবত বা শুধু পানি দিয়ে ইফতার করছেন। কেউ মাছ-মুরগির পরিবর্তে ডিম বা ডালেই ভরসা রাখছেন। কেউ আবার ফলের পরিবর্তে শুধু ভাজাপোড়া দিয়েই ইফতার সারছেন। এতে পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

সংযমের মাসে আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও সংযমের কথা বলা হয়। কিন্তু বাজারের এই বাড়তি ব্যয় নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সংযম নয়, বরং বাধ্যতামূলক সংকোচনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং প্রশাসনের নজরদারিতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ হবে। অন্যথায় রমজানের পুরো মাসজুড়েই হিসাব কষে চলতে হবে হাজারো পরিবারকে।


সম্পর্কিত বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:




রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected]; [email protected]
সম্পাদক : লিটন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top