গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি অগ্রহণযোগ্য: ইউরোপীয় নেতারা
প্রকাশিত:
১৮ জানুয়ারী ২০২৬ ০৯:৩১
আপডেট:
১৮ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:৩২
গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় আটটি মিত্র দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার এই সিদ্ধান্তকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। আর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সূত্র: বিবিসি।
ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। পরবর্তীতে এই শুল্কের হার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে এবং গ্রিনল্যান্ড কেনা নিয়ে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে।
ট্রাম্পের দাবি, ডেনমার্কের অধীন আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে তিনি বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করে দেননি।
এদিকে প্রস্তাবিত মার্কিন দখল পরিকল্পনার প্রতিবাদে শনিবার গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন।
জনসংখ্যায় কম হলেও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ড। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং নৌযান পর্যবেক্ষণে অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড ‘সহজ উপায়ে কিংবা কঠিন উপায়ে’ অর্জন করবে।
ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো বলছে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ন্যাটোর সম্মিলিত দায়িত্ব। এই অবস্থান থেকে ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য সীমিত সংখ্যক সৈন্য গ্রিনল্যান্ডে পাঠিয়েছে, যাকে তারা ‘রিকনেসাঁস মিশন’ হিসেবে বর্ণনা করছে।
শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, এসব দেশ ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলা’ খেলছে। তার মতে, এখানে প্রশ্নের মুখে রয়েছে ‘আমাদের গ্রহের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অস্তিত্ব’।
শুল্ক প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হতে যাওয়া ১০ শতাংশ শুল্ক জুনে বেড়ে ২৫ শতাংশে পৌঁছাবে এবং গ্রিনল্যান্ডের ‘সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক’ কেনাকাটা নিয়ে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে।
প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার বলেন, ‘ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করা মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ সম্পূর্ণ ভুল। এ বিষয়ে আমরা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করব।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে শুল্কের হুমকি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমরা কোনো ধরনের ভয়ভীতিতে নত হব না।’
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেন, ‘আমরা ব্ল্যাকমেইলের কাছে মাথা নত করব না।’ তিনি জানান, যৌথ প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে সুইডেন অন্যান্য ইইউ দেশ, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালাচ্ছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় সব সময় দৃঢ় থাকবে, যা শুরু হয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ড থেকে।’
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন জানান, ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি তাদের জন্য ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল।
এদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে কনজারভেটিভ ইপিপি গ্রুপের প্রধান মানফ্রেড ওয়েবার বলেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ এখনো অনুমোদন না পাওয়া ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
গত বছর ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া ওই চুক্তিতে ইইউ পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ শতাংশ শুল্ক এবং নির্দিষ্ট মার্কিন পণ্যে শূন্য শতাংশ শুল্কের কথা ছিল।
ওয়েবার বলেন, ‘ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে ইপিপি। তবে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষাপটে এখন এই চুক্তি অনুমোদন সম্ভব নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘মার্কিন পণ্যের ওপর শূন্য শতাংশ শুল্ক স্থগিত রাখা উচিত।’
অন্যদিকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, উত্তরাঞ্চলে প্রয়োজনীয় কাজ করার মতো সক্ষমতা বা সম্পদ ডেনমার্কের নেই। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে গ্রিনল্যান্ডবাসীর জীবন আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে।’
ট্রাম্প আগেও বহুবার বলেছেন, ‘শুল্ক’ তার প্রিয় শব্দ। তিনি একে বিশ্বজুড়ে দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যে আনতে চাপ প্রয়োগের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখেন।
তবে এবারের ঘোষণা গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ নিয়ে তার নতুন করে জোরালো প্রচেষ্টার বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যদিও গ্রিনল্যান্ড ও ইউরোপীয় দেশগুলো এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। কী কারণে হঠাৎ এই শুল্ক ঘোষণা, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছিল, যা ইউরোপের জন্য ‘সেরা সম্ভাব্য পরিস্থিতি’ বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু নতুন শুল্ক ঘোষণায় বিষয়টি আবারো জরুরি হয়ে উঠেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো মিত্র ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক চাপে পড়েছে।
সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: