ভোট পুনর্গণনার দাবিতে উত্তাল রংপুর, ডিসি অফিস ঘেরাও
প্রকাশিত:
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৪১
আপডেট:
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:০৩
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া), রংপুর-৩ (সদর ও রসিক) ও রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন পরাজিত বিএনপি প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় আখতার হোসেন ও জেলা প্রশাসককে ‘ভোট চোর’ উল্লেখ করে স্লোগান দেন নেতাকর্মীরা।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা এবং জেলা বিএনপি আহ্বায়ক ও রংপুর-৬ আসনের প্রার্থী সাইফুল ইসলামসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মসূচি থেকে এই আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ঘোষিত ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান প্রার্থীরা। দাবি আদায় না হলে পুরো রংপুর অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আখতার হোসেনকে জয়ী করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে বিএনপির প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা বলেন, এই নির্বাচনে আমি শতভাগ আশাবাদী ছিলাম যে, ইনশাল্লাহ জনগণের রায়ে আমি এমপি নির্বাচিত হবো। কিন্তু বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত আমাদের প্রতিপক্ষ এনসিপির আখতার হোসেন যেভাবে মব সৃষ্টি করেছে, প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে যেভাবে আমার নির্বাচনের ফলাফলটাকে ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে, এ ব্যাপারে গত শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ডিসির বাংলোতে গিয়েও কোনো দেখা পাইনি। আমার একটাই অভিযোগ, যে নির্বাচনটা হয়েছে, এর ফলাফলটা যেটা দিয়েছে, এটা আমরা পুনর্গণনা চাই।
ভরসা অভিযোগ করেন, প্রায় ৮ হাজার ৫০০ ভোট বাতিল করা হয়েছে, যা সন্দেহজনক। পুনর্গণনা করলে প্রকৃত ফলাফল বেরিয়ে আসবে বলেও জানান তিনি। সঠিক বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন বিএনপির এই প্রার্থী।
ভোট পুনর্গণনা দাবি জানিয়ে রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু বলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন শুরু করেছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাইফুল ইসলামও একই অভিযোগ তুলে ধরে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান। একই সাথে এই নির্বাচনে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ জামায়াতে ইসলামীর একটি চক্র ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে জনগণের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ছিনতাই করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
পরে তারা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসানের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে লিখিত আকারে রংপুর-৩, রংপুর-৪ ও রংপুর-৬ আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবিতে আবেদনপত্র ও স্মারকলিপি দেন। এ সময় জেলা প্রশাসকের ওপর চড়াও হন বিএনপির বিক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা।
একপর্যায়ে জেলা প্রশাসককে কাঁদতে কাঁদতে অভিশাপ দেন রংপুর-৪ আসনের পরাজিত বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা।
তিনি বলেন, ভাই, আমার অভিশাপ থাকলো। আল্লাহ আপনার বিচার করবে। আমার বউ-বাচ্চাকে কাঁদিয়ে, আমাকে কাঁদিয়ে আমার ভোট ছিনতাই করেছেন। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। আপনার ছেলে-মেয়েও রাস্তায় রাস্তায় কান্না করবে। এটা আমার অভিশাপ। আপনি আমার ভোট ছিনতাই করেছেন। এর জবাব আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনি পাবেন।
এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি জেলা প্রশাসক। তবে প্রার্থীদের অভিযোগ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, রংপুর ৩, ৪ ও ৬ আসনের বিএনপি প্রার্থীদের ভোট পুনরায় গণনার লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আমরা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অভিযোগপত্র প্রেরণ করেছি।
এর আগে গত দুদিন ধরে রংপুর-৪ ও রংপুর-৬ আসনের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেন এমদাদুল হক ভরসা ও সাইফুল ইসলামের কর্মী-সমর্থকসহ বিএনপি নেতারা।
অন্যদিকে, রংপুর-৪ আসনে হারাগাছ, পীরগাছা ও কাউনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা এনসিপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন বিজয়ী প্রার্থী আখতার হোসেন।
শনিবার দুপুরে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আখতার হোসেন লিখেছেন, হারাগাছে এখন ভরসার ভাড়া করা লোকেরা যা করছে তা নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রশাসনের কর্তারা আলোচনার মাধ্যমে আইনগতভাবে এই সমস্যার সমাধান করুন। সময়ক্ষেপন করার সুযোগ নেই। যেসব মানুষদের ভাড়া করে আনা হয়েছে তারা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।
আখতারের দাবি, ভরসার নেতাকর্মী তাদেরকে লোভ দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে বিভ্রান্ত করছে। এই আইন লঙ্ঘনের পরিস্থিতির দায়ভার বিএনপির হাইকমান্ডকে নিতে হবে। এখানে অধিকাংশ মানুষ কোনো কিছু না বুঝে, আইনের বিষয়ে অবগত নয় জন্য, দিনহাজিরার বিনিময়ে এসেছে।
তিনি আরও লিখেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ কোনোভাবেই ভরসার লোকদের দ্বারা জোর করে ধরে নিয়ে এসে মিছিল করানো এসব জিম্মি থাকা নিরীহ মানুষদের প্রতি কোনোরুপ ফোর্স এপ্লাই করা যাবে না। আলোচনা করে আইনি পন্থায় সুরাহা করুন। যারা ভাঙচুর লুটপাট আহত করছে শুধু সেসব সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসুন। সাধারণ মানুষরা নিরাপদ থাকবে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ আসনে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ঘোষিত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, রংপুর-৩ (সদর ও সিটি কর্পোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী বিএনপির সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট।
রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে এনসিপির আখতার হোসেন শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর নুরুল আমীন ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট।
সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: