রবিবার, ৩রা মে ২০২৬, ২০শে বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
সিন্ডিকেট দমন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সন্ধ্যার মধ্যে মার্কেট বন্ধ রাখা, খাদ্যে ভেজাল ও বাল্যবিবাহ রোধসহ মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (৩ মে) দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশনা দেন।
সম্মেলনে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্য ডিসিদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সন্ধ্যার মধ্যে মার্কেট বন্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে ডিসিদের কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে মোবাইল কোর্টের (ভ্রাম্যমাণ আদালত) কার্যক্রম বাড়ানো এবং জনগণের ন্যায্য অভিযোগগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দেন তিনি।
এ সময় ডিসিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শুধুমাত্র পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপোষ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাময়িকভাবে হয়তবা লাভবান হতে পারেন। তবে সেটি সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনের দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সুতরাং, জন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সব পদেই কাজ করার মানসিকতা থাকা জরুরি। সবসময় নিজেদের পছন্দের পদে পদায়ন কিংবা পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতাই জনপ্রশাসনকে দুর্নীতিপরায়ণ এবং অপেশাদার করে তোলার অন্যতম একটি কারণ বলে আমার মনে হয়। আমার ধারণা, আমার এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আপনারা একমত। সুতরাং, আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান, জন প্রশাসনের প্রতিটি পদকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য ভাবুন। দেশের যে কোনো স্থানেই যে কোনো সময় জনপ্রশাসনের যে কোনো পদে দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদেরকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন। আপনাদেরকে মনে রাখা জরুরি, একটি সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয় জন প্রশাসনের কোনো পদও কারো জন্য চিরস্থায়ী নয়।
তিনি আরো বলেন, আমার বিশ্বাস, জনপ্রশাসনে পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে। নিজেরা সরাসরি ভোট দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী শাসন ব্যবস্থার প্রত্যাশায় থাকা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে বর্তমান সরকার।
সুতরাং, জনগণ সরকারের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্খার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়। সরকারের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আপনারা বিশেষ করে বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলে প্রশাসকগণই জনপ্রশাসনের সঙ্গে সরকারের প্রধান সেতুবন্ধন। আপনাদের সততা, কর্মদক্ষতা এবং দায়বদ্ধতার উপর সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সাফল্য অনেকখানি নির্ভর করে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনারা ভালোভাবে অবগত আছেন। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল বিভাজিত জনপ্রশাসন এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। আমরা অবস্থার পরিবর্তন করছি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি লুটপাট রাষ্ট্র এবং জনগণকে ঋণগ্রস্ত করে ফেলেছে।
আরও পড়ুন: শপিংমল রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখতে চান ব্যবসায়ীরা
৩০ লক্ষ কোটি টাকা ঋণের বোঝা বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দেশকে আমদানি নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছে। দেশে দারিদ্র এবং বেকারত্ব বেড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। প্রতিটি সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুদক সবকিছুই ছিল অকার্যকর। শিক্ষা-স্বাস্থ্য সব সেক্টরেই ছিল ভঙ্গুর অবস্থা। এ সব সেক্টর ক্রমান্বয়ে ঠিক করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে চাই, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা, প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বদ্ধপরিকর। এ নিয়ে কারো মনে কোনো সংশয়ের কারণে নেই। আমি আশা করি আপনারা আপনাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি, দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন। আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে অবস্থান করছেন।
তিনি বলেন, এই সম্মেলন কেবল আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের জায়গা নয়; বরং এটি এমন একটি পরিসর, যেখানে মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজন এবং উদ্ভাবনী চিন্তা সরাসরি জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হতে পারে। আপনারা মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রশাসনিক দূত। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। ইচ্ছেমতো যাতে কেউ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়াতে না পারে কিংবা মজুতদারি বা কারসাজির মাধ্যমে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি অপচেষ্টা করতে না পারে এ জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার রাখতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এটি সামাজিক স্থিতি ও জনগণের আস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তিনি আরও বলেন, কৃষক যেন তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়. পাশাপাশি কৃষকের জন্য সার, বীজ, সেচ, সংরক্ষণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং গ্রামীণ জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জনগণের শহরমুখিতা হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নিয়ামক হিসেবে দেখতে হবে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কার্যকর, নিয়মিত এবং দৃশ্যমান করতে হবে। যাতে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অপরাধ দ্রুত দমন করা সম্ভব হয়।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি সহজতর করা, সরকারি সেবাকে হয়রানিমুক্ত করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি কার্যালয়ে সেবাপ্রার্থীরা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানি, বিলম্ব কিংবা অনিয়মের শিকার না হন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। জনগণের যে কোনো ন্যায্য অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বিষয়।
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রো-অ্যাকটিভ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনপ্রশাসনকে গণমুখী না করা গেলে জনগণ সরকারের কার্যক্রমের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সরকারের যাবতীয় গণমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকার জনপ্রশাসনের উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন সেক্টর চিহ্নিত করে সরকার দেশে বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং জনস্বার্থে স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। ধর্মীয় সামাজিক মুল্যবোধগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। আমরা একটি প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক ও নৈতিক রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, মত বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য থাকবে না। জাতীয় ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, থাকা স্বাভাবিক কিন্তু দেশের স্বার্থে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)