রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০ই ফাল্গুন ১৪৩২
ফাইল ছবি
পবিত্র রমজান সামনে রেখে দেশের অনলাইন বাজারে এখন ছাড়ের হিড়িক। বড় বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে অনলাইন মুদি দোকান—সবাই দিচ্ছে বিশেষ অফার, কুপন, ফ্ল্যাশ সেল ও ফ্রি ডেলিভারির প্রলোভন। প্রচারে বলা হচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মিলছে কম দামে। কিন্তু বাস্তবে বাজারদরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ছাড়ের পরও দাম কি সত্যিই কমছে, নাকি আগের নির্ধারিত দামের মধ্যেই সীমিত থাকছে?
রাজধানীর কয়েকটি জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ঘেঁটে দেখা গেছে, ছোলা, চিনি, ডাল, তেল, চাল, খেজুর, সেমাই, মসলা, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, শসা, বেগুন, কলা, আপেল, কমলালেবু, মুরগি ও গরুর মাংসসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যে বিশেষ ছাড় দেখানো হচ্ছে। কোথাও ৫ শতাংশ, কোথাও ১০ শতাংশ, আবার কিছু পণ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ঘোষণা রয়েছে। তবে এসব ছাড়ের হিসাব করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পণ্যের মূল দাম বাজারদরের কাছাকাছি রেখেই অফার দেওয়া হচ্ছে।
অনলাইনে ছোলার কেজি ১১৫ টাকা থেকে ১০৫ টাকায় নামিয়ে ছাড় দেখানো হচ্ছে। অথচ খোলা বাজারে একই সময়ে ছোলার দাম ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ ছাড়ের পর অনলাইন দাম বাজারের সমান বা সামান্য কম, কিন্তু বড় কোনো পার্থক্য নেই। একইভাবে চিনির ক্ষেত্রে অনলাইনে ১৩০ টাকা থেকে ১০৫ টাকায় নামানোর কথা বলা হলেও বাজারে দাম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও অনলাইনে ২০৫ টাকা থেকে ১৯৫ টাকায় ছাড় দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাজারে বোতলজাত তেল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ ছাড়ের পরও অনলাইন দাম বেশি।
খেজুরে পার্থক্য আরও স্পষ্ট। অনলাইনে প্যাকেটজাত মাঝারি মানের খেজুর ৬৫০ টাকা থেকে ৬২০ টাকায় ছাড়ে দেওয়া হচ্ছে (৫০০ গ্রাম)। কেজি হিসেবে দাঁড়ায় প্রায় ১,২৪০ টাকা। একই সময়ে বাজারে মানভেদে ৭০০ থেকে ১,৪০০ টাকার মধ্যে খেজুর মিলছে। অর্থাৎ অনলাইনে উন্নত মানের প্যাকেটজাত পণ্যকে ছাড়ের আওতায় আনা হলেও খোলা বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিকল্প পাওয়া যাচ্ছে।
চালের ক্ষেত্রে অনলাইনে পাঁচ কেজি মিনিকেট চাল ৪০০ টাকা থেকে ৩৮৯ টাকায় নামানো হয়েছে। সঙ্গে আলাদা করে যুক্ত হবে ডেলিভারি চার্জ। বাজারে একই চাল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি দরে, অর্থাৎ পাঁচ কেজি ৩৫০ থেকে ৩৭৫ টাকার মধ্যে। এখানে ছাড়ের পর অনলাইন দাম বাজারদরের চেয়ে বেশি।
ডিমের ক্ষেত্রে অনলাইনে ডজন ১১৫ টাকা থেকে ১০৮ টাকায় নামানো হয়েছে। বাজারে একই সময়ে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পার্থক্য খুব বেশি নয়। আলু, পেঁয়াজ, শসা ও বেগুনের মতো সবজিতেও অনলাইন ছাড়ের পর দাম বাজারের গড় দামের সঙ্গে প্রায় মিলছে।
মুরগি ও গরুর মাংসের ক্ষেত্রেও ছাড়ের প্রচার রয়েছে। অনলাইনে গরুর মাংস ৮৬০ টাকা থেকে ৭৯৯ টাকায় নামানো হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। অথচ বাজারে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা আগেই একটি নির্দিষ্ট দাম ঠিক করেন। সেই দামের ওপর সামান্য কমিয়ে ছাড় দেখানো হয়। অর্থাৎ যে দামে বিক্রি করার পরিকল্পনা ছিল, সেটিকেই সামান্য সমন্বয় করে অফার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কাগজে-কলমে ছাড় থাকলেও বাস্তবে দাম বাজারদরের কাছাকাছিই থাকে।
তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দাবি, তারা সরাসরি সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য এনে তুলনামূলক কম মার্জিনে বিক্রি করে। পাশাপাশি সময় সাশ্রয়, বাড়িতে ডেলিভারি এবং নির্দিষ্ট মানের পণ্য নিশ্চিত করার সুবিধাও রয়েছে। অনেক ক্রেতা বলছেন, রোজার ব্যস্ত সময়ে বাজারে না গিয়ে বাসায় বসে পণ্য পাওয়া তাদের জন্য বড় সুবিধা।
ভোক্তা অধিকার–সংশ্লিষ্টদের মতে, ছাড়ের ঘোষণা দেখেই কেনাকাটা না করে আগে বাজারদর মিলিয়ে দেখা উচিত। কারণ সব পণ্যে সমানভাবে দাম কমছে না। কোথাও ৫ টাকা কম, কোথাও ১০ টাকা বেশি—এভাবে পণ্যভেদে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)