রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩রা ফাল্গুন ১৪৩২


বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারবে ভারত?


প্রকাশিত:
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৪

আপডেট:
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪৭

ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি যখন নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেলো তখন ভারত নতুন সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে উষ্ণ শুভেচ্ছা জানাল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানকে জয়ের জন্য শুভেচ্ছা জানান। তিনি একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্বর্তী বাংলাদেশকে সমর্থনের আশ্বাস দেন। এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমুখী সম্পর্ক জোরদারে গভীরভাবে কাজ করবেন বলে জানান।

তার এ শুভেচ্ছা ছিল সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা। তবে খুব সতর্কতার সঙ্গে তিনি এ বার্তা দিয়েছেন। সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেন-জির গণঅভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসে ব্যাপক অবনতি হয়। এরপর সদ্য হওয়া জাতীয় নির্বাচনে হাসিনার আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

হাসিনার স্বৈরাচার হওয়ার জন্য অনেক বাংলাদেশি ভারতেক দোষারোপ করেন। এর ওপর সীমান্ত হত্যা, পানি নিয়ে বিরোধ, বাণিজ্যে বিধিনিষেধ ও ভারতের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় আগে থেকেই ছিল। দুই দেশের মধ্যে ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধ আছে। আন্তঃদেশীয় বাস, ট্রেন এখন আর চলছে না। সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচলও বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ মুহূর্তে ভারত সরকার যোগাযোগ তৈরি করবে?— প্রশ্ন এটি নয়, প্রশ্ন হলো কীভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের সীমারেখা নিশ্চিত রেখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে যোগাযোগ করবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন সম্ভব?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আবারও ভারত সম্পর্ক গড়তে পারবে। তবে এক্ষেত্রে সংযম ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রফেসর অবিনাশ পালিওয়াল সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেছেন, "নির্বাচনী দৌড়ে থাকা দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং মধ্যপন্থী হিসেবে বিএনপিই এখন ভারতের জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ বা নির্ভরযোগ্য বিকল্প। তবে প্রশ্ন থেকে যায়— তারেক রহমান কীভাবে দেশ শাসন করবেন? তিনি পরিষ্কারভাবেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছেন। কিন্তু এটি মুখে বলা যত সহজ, কাজে পরিণত করা ততটা সহজ নয়।"

ভারতের জন্য বিএনপি কোনো অজানা কোনো দল নয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০১ সালে যখন দলটি আবারও ক্ষমতায় ফিরেছিল তখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খুব দ্রুত সময়ে ঠান্ডা হয়ে যায়। জামায়াত-বিএনপি ওই সরকারের পুরোটা ছিল ভারতের জন্য ছিল ‘অবিশ্বাস আর সমস্যার সময়’।

যদিও ভারতের সঙ্গে ওই সরকারের শুরুটা হয়েছিল সৌজন্যতার সঙ্গে। ভারতের তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রাজেস মিশ্রা প্রথম বিদেশি কূটনীতিক হিসেবে খালেদা জিয়াকে সবার আগে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস ছিল খুবই কম।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ওই বিএনপি সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সৌহায্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখেছিল। এতে করে ভারতের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয় বাংলাদেশ হয়ত তাদের বলয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।

এরপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কার্যক্রম, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার এবং সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত হামলা নিয়ে সম্পর্কে অবনতি ঘটে। যা দিনদিন আরও খারাপ হয়।

২০১৪ সালে খালেদা জিয়া নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন। যা ব্যাপকভাবে ভারতকে বিএনপির প্রত্যাখ্যান করা হিসেবে দেখা হয়েছিল।

আর এ কারণেই স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ওপর ভারত তার সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেছিল। ক্ষমতায় থাকার ১৫ বছরে হাসিনা দিল্লিকে এমন কিছু দিয়েছেন যা ভারত তার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি আশা করে: বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সহযোগিতা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এমন একটি সরকার যা চীনের চেয়ে ভারতের সাথে বেশি জোটবদ্ধ ছিল। যদিও কৌশলগতভাবে এটি খুবই মূল্যবান ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দিক দিয়ে এটি ছিল চরম ব্যয়বহুল।

শেখ হাসিনা বর্তমানে পালিয়ে ভারতে আছেন। গণঅভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। তার ভারতে পালিয়ে থাকা এবং তাকে ফেরত না দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও খারাপ করেছে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এরমধ্যে তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠ করেন। এরমধ্যে সম্প্রতি তারেক রহমান স্লোগান দেন ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’। যারমাধ্যমে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ কোনো সময় নষ্ট না করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্জীবিত করে। ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর সরাসরি দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। ১৩ বছর পর পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা আসা-যাওয়া করেছেন। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা-সহযোগিতা সম্পর্ক আবারও ফিরে এসেছে এবং ২০২৪-২৫ সালে বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বেড়েছে।

ভারতের নয়াদিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিস অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের স্মৃতি পট্টনায়ক বলেছেন, “আমাদের উদ্বেগের কারণ এটা নয় যে, পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আছে। একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে তাদের সেই অধিকার রয়েছে। যেটি অস্বাভাবিক ছিল তা হলো, হাসিনার শাসনামলে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক একেবারেই ছিল না। সম্পর্ক একদিকে (ভারতের দিকে) ঝুকে ছিল। এখন শঙ্কা দেখা দিয়েছে এটি অন্যদিকে (পাকিস্তানের দিকে) ঝুকে যাবে।”

হাসিনার ভারতে আশ্রিত থাকার বিষয়টি নতুন সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “বিএনপিকে এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যে, হাসিনাকে ভারতের ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। একই সাথে, ঢাকার অন্যান্য বিরোধী দলগুলো সরকারের ওপর চাপ দিয়ে যাবে যেন তারা ভারতকে হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ দেয়। বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এটিই হবে বিরোধী দলগুলোর অন্যতম শক্তি।”

যা বিএনপির জন্য সহজ হবে না

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির শ্রীরাধা দত্ত বলেছেন, হাসিনা ও আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী ভারতে পালিয়ে আছেন তারা সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেক বাধা হবেন।

তিনি বলেছেন, "দিল্লি যদি তাদের মাটি ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করে, তবে তা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নির্বাসনে থেকে নির্বাচনের আগে হাসিনা যেসব সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন, সেগুলো ছিল বেশ বিভ্রান্তিকর। তিনি যদি নিজের ভুল স্বীকার না করেন অথবা দলের নেতৃত্বের পরিবর্তনের সুযোগ দিয়ে নিজে সরে না দাঁড়ান, তবে ভারতে তার এই অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে।"

এছাড়া সীমান্ত সমস্যা, ভারতীয় রাজনীতি ও টেলিভিশনে উস্কানিকমূলক কথাবার্তাও আরেক সমস্যার বিষয়। কারণ এসবের কারণে বাংলাদেশিদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছে ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম দেশের বদলে নিজেদের হাতের পুতুল মনে করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সম্পর্ক নির্ভর করবে বাংলাদেশের নতুন সরকার ভারত বিরোধী মনোভাব কতটা কমাতে পারে। অপরদিকে ভারত বাংলাদেশকে নিয়ে উস্কানি কতটা বন্ধ করতে পারে।


সম্পর্কিত বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:




রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected]; [email protected]
সম্পাদক : লিটন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top