শুক্রবার, ১লা মে ২০২৬, ১৭ই বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
পিএসজি-বায়ার্ন মিউনিখ ম্যাচে আলোচনায় ছিল গোল উৎসব। ৯ গোলের সেই ম্যাচের আমেজ কাটার আগেই গতকাল রাতে ১-১ গোলে ড্র করে আর্সেনাল-আতলেতিকো মাদ্রিদ। দুটোই চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনাল প্রথম লেগের ম্যাচ। প্রথম ম্যাচের শিরোনাম যদি হয় আনন্দময় ফুটবল, তবে দ্বিতীয় ম্যাচে আলোচনায় উঠে এসেছেন অফিশিয়ালরা।
আর্সেনাল-আতলেতিকো ম্যাচের গল্পটা আসলে তিন পেনাল্টির। একটিতে গোল করেছে আর্সেনাল, অন্যটিতে গোল করেছে আতলেতিকো। বিতর্কটা মূলত তৃতীয় পেনাল্টি নিয়ে, যেটা ৮১ মিনিটে আর্সেনাল পেলেও পরে ভিএআরে তা বাতিল হয়।
আতলেতিকো ডিফেন্ডার ডেভিড হানকো বক্সের ভেতর আর্সেনালের এবেরেচি এজেকে ল্যাং মারলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি ড্যানি মাক্কেলি। এ ঘটনায় পেনাল্টি পায় আর্সেনাল। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) মাক্কেলিকে এরপরই মাঠের পাশে মনিটরে ঘটনাটির রিপ্লে দেখার পরামর্শ দেন। রিভিউ শেষে ভিএআর এবং রেফারির সিদ্ধান্তে পেনাল্টিটি বাতিল হয়ে যায়। এতে ভীষণ খেপেছেন আর্সেনালের কোচ মিকেল আরতেতা।
ম্যাচ শেষে আরতেতা বলেন, ‘এখানে (রেফারির সিদ্ধান্তে) স্পষ্ট কোনো ভুল ছিল না। অথচ এই একটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই পর্যায়ের ফুটবলে এমনটা হওয়া মোটেও কাম্য নয়।’
রেফারি মাক্কেলি তাঁর সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে আর্সেনাল কোচের উত্তর ছিল, ‘না। কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। একজন রেফারিকে দীর্ঘ সময় ধরে যদি ১৩ বার রিপ্লে দেখতে হয়, তবে এর চেয়ে বেশি স্পষ্ট আর কী হতে পারে? আমরা সবাই এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষুব্ধ।’
আতলেতিকোর বিপক্ষে বাতিল হওয়া পেনাল্টি নিয়ে আর্সেনালের আক্ষেপ আরও বাড়বে। কারণ, মাত্র গত মাসেই ঠিক একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন এক সিদ্ধান্ত পেয়েছে আর্সেনাল।
লেভারকুসেনের বিপক্ষে শেষ ষোলো প্রথম লেগের ম্যাচে বক্সের ভেতর মালিক টিলম্যানের চ্যালেঞ্জে আর্সেনালের ননি মাদুয়েকে পড়ে গেলে পেনাল্টি পেয়েছিল গানাররা। মাদুয়েকের সঙ্গে টিলম্যানের শারীরিক সংস্পর্শ ছিল খুবই সামান্য। মাদুয়েকের বুটের ওপর পা পড়েছিল টিলম্যানের, তাতে পড়ে যান আর্সেনাল উইঙ্গার।
বিবিসি স্পোর্টস এ ঘটনা নিয়ে উয়েফার রেফারি কমিটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছিল। তিনি ব্যাখ্যা দেন, মাঠের রেফারি পেনাল্টি না দিলেই হয়তো ভালো হতো, কিন্তু যেহেতু টিলম্যানের পা মাদুয়েকের বুটে লেগেছিল, তাই ভিএআরের পক্ষে সেই পেনাল্টি বাতিল করা সম্ভব ছিল না।
সেখানে দেখা যায়, আর্সেনালের মিডফিল্ডার এবেরেচি এজে বল সরিয়ে নিলেও আতলেতিকো ডিফেন্ডার হানকো তাঁর বুটে পরিষ্কার আঘাত করেছেন।
আঘাতটা খুব জোরাল ছিল না। তাহলে মাঠে রেফারির সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল? মাদুয়েকের ঘটনায় উয়েফা যা বলেছিল, সে অনুযায়ী মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল থাকা উচিত ছিল বলে মনে করে বিবিসি স্পোর্টস।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেও একই যুক্তি মানা হয়। ফাউলটি সামান্য মনে হলেও মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তের বিপরীতে যাওয়ার মতো কোনো জোরাল কারণ ছিল না।
বিবিসির মতে, যদি মাদুয়েকের পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বহাল থাকে, তবে একই নিয়ম এজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ম্যাচটি যদি প্রিমিয়ার লিগের হতো, তবে এজের পেনাল্টি কোনোভাবেই বাতিল হতো না।
বিশেষজ্ঞ যা বলছেন
ইএসপিএন এই ঘটনার ব্যাখ্যার জন্য যোগাযোগ করেছিল ইংল্যান্ডের সাবেক রেফারি অ্যান্ডি ডেভিসের সঙ্গে। তিনি ইংল্যান্ডের পেশাদার রেফারিদের প্যানেল ‘সিলেক্ট গ্রুপ’–এর সাবেক সদস্য। প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নশিপ মিলিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় এলিট প্যানেলে রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ডেভিস। শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলের পাশাপাশি প্রিমিয়ার লিগের ভিএআর কার্যক্রমেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি।
ভিএআরে পেনাল্টি বাতিলের ব্যাখ্যা:
ডেভিসের মতে, বেশ কয়েকবার রিপ্লে দেখার পর ভিএআরের মনে হয়েছে, আতলেতিকো ডিফেন্ডার যেভাবে এজেকে স্পর্শ করেছেন, তা পেনাল্টি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। যুক্তি হলো, এজের সঙ্গে হানকোর শারীরিক সংস্পর্শ ছিল খুব সামান্য এবং আতলেতিকো ডিফেন্ডার তাঁকে সরাসরি ল্যাং মারেননি, বরং এজে নিজেই হানকোর পায়ের ওপর পড়ে যান।
ডেভিস জানিয়েছেন, খেলার মুহূর্তে সরাসরি দেখে তাঁর মনে হয়েছে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। রিপ্লে দেখার পরও ডেভিসের মত বদলায়নি। সাবেক এই রেফারির ব্যাখ্যা, চ্যালেঞ্জ জানাতে হানকো কিছুটা দেরি করে ফেলেছিলেন। তিনি বলের নাগাল পাননি, উল্টো এজের বুটে আঘাত করেছেন। অসতর্কভাবে ল্যাং মারলে যে শাস্তি হয়, সেই মাপকাঠিতে এটা পেনাল্টি ছিল বলে মনে করেন ডেভিস।
ডেভিস আরও উল্লেখ করেন, মাঠে রেফারির পজিশনও সুবিধাজনক জায়গায় ছিল। ঘটনাটি তিনি পরিষ্কার দেখেছেন এবং তাঁর শরীরী ভাষা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত বেশ জোরালই ছিল।
এ ঘটনায় ভিএআর কেন হস্তক্ষেপ করল, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন বলে মনে করেন ডেভিস। ফুটেজে পরিষ্কার দেখা গেছে, ডিফেন্ডারের চ্যালেঞ্জটি ছিল দেরিতে এবং পায়ে আঘাতও লেগেছে। মাঠে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেওয়াটা কোনোভাবেই ‘স্পষ্ট ও দৃশ্যমান ভুল’ ছিল না বলে মনে করেন ডেভিস।
রেফারি যখন মনিটরের সামনে যান, তখন সব সুযোগই খোলা ছিল। ডেভিসের ধারণা, ভিএআরে প্রভাবিত হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন মাঠের রেফারি। ভিএআর রেফারি হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে শারীরিক সংস্পর্শ ছিল খুবই সামান্য এবং পেনাল্টি আদায়ের দিকেই খেলোয়াড়ের ঝোঁক ছিল বেশি।
ডেভিসের মতে, দুই অফিশিয়ালই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এ ঘটনায় আর্সেনালের ক্ষুব্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)