রবিবার, ৮ই মার্চ ২০২৬, ২৪শে ফাল্গুন ১৪৩২


প্যানিক বায়িংয়ের প্রভাব

পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ পোস্টার, জ্বালানি সংকটে দিশেহারা চালকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৮ মার্চ ২০২৬, ১০:১৮

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুত করার হিড়িকে ঢাকার বেশকিছু এবং গাজীপুরের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন এখন পুরোপুরি তেলশূন্য।

রোববার (৮ মার্চ) সকাল থেকেই রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের পাম্পগুলোতে ঝুলছে ‘পেট্রোল নেই’, ‘অকটেন নেই’ লেখা সংবলিত হাতে লেখা পোস্টার ও ব্যানার। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছেন মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের চালকরা।

এমন অবস্থায় তেলের খোঁজে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরে ব্যর্থ হয়ে অনেককেই গাড়ি নিয়ে রাস্তার পাশে বা বন্ধ পাম্পের সামনেই অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তবে তেলের সংকট থাকলেও হাতেগোনা কিছু পাম্পে সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, যেখানে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে।

সরেজমিনে সকাল থেকে গাজীপুর ও ঢাকার অন্তত ৮টি স্পট ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনই কার্যত জনশূন্য। বিক্রয়কর্মীদের বদলে সেখানে কেবল নিরাপত্তাকর্মীদের বসে থাকতে দেখা গেছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পাম্পের প্রবেশপথে আড়াআড়িভাবে দড়ি বা ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে কিছু পাম্পে সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সেখানে ছিল যানবাহনের উপচে পড়া ভিড়। তেলের অভাবে আন্ত:জেলা রুটে চলাচলকারী কয়েকটি মিনিবাসকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে সারি করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

গাজীপুরের খাঁপাড়া রোড সংলগ্ন এশিয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকাল থেকে ৪টা পাম্প ঘুরলাম, কোথাও এক লিটার তেলও পেলাম না। অফিসে যাব কীভাবে বুঝতে পারছি না। এখনই এই অবস্থা হলে সামনের দিনগুলোতে কি হবে বুঝতে পারছি না।

গাড়িতে তেল নিতে আসা আরিফ আহমেদ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, এমন অবস্থা হলে রাস্তায় আর গাড়ি বের করা সম্ভব হবে না। এখন যে গ্যারেজে যাব সেই তেলটুকুও নেই। এখানে এসে দেখি তেল নাই বোর্ড ঝুলছে। এখন গাড়ি রাস্তায় ফেলে রাখা ছাড়া উপায় নেই।

পাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তাকর্মী বলেন, গত কয়েকদিন থেকেই মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেয়েছি। সবাই ড্রাম ভরে তেল নিতে চাচ্ছিল। গতকালই আমাদের স্টক শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের কাজ শুধু মানুষকে নেই বলে বিদায় করা।

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মধ্যেও রাজধানীর বিমানবন্দরসহ কয়েকটি এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ওই এলাকার মাত্র দুটি ফিলিং স্টেশনে তেল মজুত থাকায় সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন শত শত চালক। তবে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় পাম্প কর্তৃপক্ষ সরকার নির্দেশিত ‘রেশনিং’ বা লিমিটেড পরিমাণে তেল সরবরাহ করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই দুই পাম্পকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দর সড়কে তৈরি হয়েছে যানবাহনের বিশাল জটলা। তেলের আশায় অপেক্ষা করছেন কমপক্ষে ২০০-৩০০ চালক। পাম্প দুটির প্রবেশমুখে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা।

সোহরাব হোসেন নামের এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, সারা শহর ঘুরে কোথাও তেল পাইনি, এখানে এসে শুনলাম তেল দিচ্ছে। লাইনে দাঁড়িয়েছি দুই ঘণ্টা হলো, গাড়ি কখন পাম্পের মুখে পৌঁছাবে জানি না।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট এড়াতে আজ রোববার (৮ মার্চ) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নির্দিষ্ট যানবাহনের ধরন অনুযায়ী তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এই নতুন পদ্ধতির বিষয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।

বিপিসির প্রকাশিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন সংগ্রহ করতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির (কার) ক্ষেত্রে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লিটার। এছাড়া স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) বা জিপ এবং মাইক্রোবাসের জন্য দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পরিবহন খাতের জন্য ডিজেল সরবরাহেও কঠোর রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। স্থানীয় রুটের বাস বা পিকআপ ভ্যান দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। অন্যদিকে, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনারবাহী লরির জন্য দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় এই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়