মঙ্গলবার, ১০ই মার্চ ২০২৬, ২৬শে ফাল্গুন ১৪৩২


ইরানে ট্রাম্পের ‘এন্ডগেম’ : শাসন পরিবর্তন নাকি শুধুই যুদ্ধের দামামা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত:১০ মার্চ ২০২৬, ১০:১৫

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির জনপদে যুদ্ধের বারুদ যেন কিছুতেই নিভছে না। গত বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আরও ভয়াবহ রূপে ইরানের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে বিমান হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই নতুন দফার লড়াই এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দিল। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ইরাক আক্রমণের যে ছক ওয়াশিংটন এঁকেছিল, বর্তমানের এই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ যেন তারই এক আধুনিক ও বিধ্বংসী সংস্করণ।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা থেকে শুরু করে সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো— মার্কিন-ইসরায়েলি নিশানায় এবার সবই অন্তর্ভুক্ত। তবে, তেহরানের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনের চেয়েও এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এক ধোঁয়াশাপূর্ণ প্রশ্ন: ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য কী? তিনি কি কেবল গত বছরের অপূর্ণ থাকা সামরিক দম্ভ পূরণ করতে চান, নাকি নেপথ্যে সাজানো হয়েছে ইরানের শাসনব্যবস্থা আমূল বদলে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী কোনো ছক?

ট্রাম্পের স্ববিরোধী বার্তা আর তেহরানের অনড় অবস্থানের মাঝে দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি ও ওয়াশিংটনের অঘোষিত ‘এন্ডগেম’ বিশ্লেষণ করেছেন আল-জাজিরার ডিজিটাল করেসপন্ডেন্ট আবিদ হোসেন। তার বিশেষ প্রতিবেদনটি ঢাকা পোস্টের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের দুই দশকেরও বেশি সময় পর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে যা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দিল। ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এবং উদ্দেশ্য নিয়ে নানা স্ববিরোধী তথ্য সামনে আসছে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— ওয়াশিংটন আসলে কী চায়?

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের প্রায় ২,০০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। তেহরানে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে এই অভিযানে হত্যা করা হয়েছে। অভিযানের পরের ধাপে হামলা চালানো হয়েছে পারমাণবিক স্থাপনা, জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং তেল শোধনাগার ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের মতো অতি-গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোতে।

জবাবে ইরানও ইসরায়েল ও প্রতিবেশী দেশগুলো লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন ছুড়েছে। তেহরানের দাবি, তাদের এই পাল্টা হামলা ছিল মূলত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং মার্কিন দূতাবাসগুলোকে লক্ষ্য করে।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ১,২০০-এর বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি স্কুলে বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬০ জনেরও বেশি শিশু শিক্ষার্থী। এই যুদ্ধে সাতজন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন। তবে এত কিছুর পরও বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখনও পরিষ্কার করেনি যে এই যুদ্ধের শেষ কোথায় বা তারা আসলে কী অর্জন করতে চায়।

গত ১০ দিনের যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত নানা পদক্ষেপ, সেগুলোর বর্তমান প্রভাব এবং আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত— তা এখানে বিশ্লেষণ করা হলো :

শাসক পরিবর্তন : লক্ষ্য কি তবে বর্তমান ব্যবস্থার পতন?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। উল্লেখ্য, খামেনি দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন এবং এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত সরাসরি ‘শাসক পরিবর্তন’ (Regime Change) শব্দটি উচ্চারণ না করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের নেপথ্য উদ্দেশ্যই ছিল বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো।

পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফা হায়দার সৈয়দ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বর্তমান সরকারকে দ্রুত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা এবং দেশটিতে একটি গণঅভ্যুত্থান উসকে দেওয়া।’

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ের অধ্যাপক মুহানাদ সেলুমের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশলের পেছনে একটি ‘অঘোষিত বাজিকর’ মনোভাব কাজ করছে। 

তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, “ওয়াশিংটন সম্ভবত ধরে নিয়েছে যে— ‘শাসনব্যবস্থার মাথা’ (শীর্ষ নেতৃত্ব) এবং শরীরের উল্লেখযোগ্য অংশ (অন্যান্য নেতা) ছেঁটে ফেলতে পারলে পুরো সিস্টেমটি হয় ভেঙে পড়বে, নয়তো এতটাই দুর্বল হয়ে যাবে যে সেখান থেকে আর কখনওই যুদ্ধের আগের সেই শক্তিশালী ইরান ফিরে আসা সম্ভব হবে না।”

বাস্তবতা হলো, খামেনি ছাড়াও অনেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও নেতা নিহত হওয়া সত্ত্বেও ইসলামিক রিপাবলিকের স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বড় কোনো ফাটল ধরার প্রমাণ এখন পর্যন্ত মেলেনি। গত রোববার ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনির ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করেছে।

মুস্তাফা হায়দার সৈয়দ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমি মনে করি এটি ট্রাম্পের একটি ভুল হিসাবনিকাশ ছিল। কারণ, তারা আশা করেনি এবং বুঝতেও পারেনি যে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সহনশীলতা ও শক্তি ইরানের রয়েছে।’

আইআরজিসি ও কূটনীতিকদের সঙ্গে ডিল : সমঝোতা নাকি সংঘাত?

তথাকথিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর মুহূর্ত থেকেই ট্রাম্পের বার্তাগুলো কখনও ‘সমঝোতা’, আবার কখনও ইরানকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকির মধ্যে দুলছে। 

শুরুতে তিনি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ এবং আত্মসমর্পণের বিনিময়ে দায়মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইরানি কূটনীতিকদের পক্ষ ত্যাগ করার আহ্বান জানান।

কিন্তু বাস্তবে আইআরজিসি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানি কূটনীতিকরা একটি খোলা চিঠিতে ট্রাম্পের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের দায়িত্বে অবিচল রয়েছেন।

অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আইআরজিসি মাত্রই নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাই চলমান এই বোমাবর্ষণের মধ্যে কোনো পক্ষের জন্যই আলোচনার মতো রাজনৈতিক পরিবেশ অবশিষ্ট নেই।’

লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা নির্মূল করা

ট্রাম্প ও তার প্রশাসন বারবার ইরানের সামরিক শক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছে। বিশেষ করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা এবং দেশটির নৌবাহিনী ধ্বংস করাকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইতোমধ্যে ইরানের নৌ-সম্পদ (যার মধ্যে শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে থাকা একটি যুদ্ধজাহাজও রয়েছে) এবং ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। উভয় দেশই এখন দাবি করছে যে, ইরানের আকাশসীমা বর্তমানে তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।

তবে বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুমের যুক্তি হলো— শুধুমাত্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ওয়াশিংটন তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। তিনি বলেন, “কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যতটা প্রয়োজন ছিল, সামরিক শক্তির ব্যবহার তার চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের সমরাস্ত্র বা ‘হার্ডওয়্যার’ ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু আকাশ থেকে বোমা ফেলে কখনওই একটি বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করতে পারবে না।”

‘ক্ষমতা দখল করুন’— তবে নেতা কে হবে, তা ঠিক করবেন ট্রাম্প!

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা করার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ইরানের মহান জনগণের উদ্দেশ্যে আমি বলছি, আপনাদের মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিন। এই সরকার হবে একান্তই আপনাদের।’ 

পরবর্তীতে ট্রাম্প আরও বলেন যে, যুদ্ধ-পরবর্তী সরকার পরিচালনার জন্য তিনি ইরানের ভেতর থেকেই কাউকে পছন্দ করবেন। এর মাধ্যমে তিনি কার্যত ইরানের সাবেক শাহ-এর ছেলে রেজা পাহলভির গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছেন। পাহলভি কয়েক দশক ধরে ইরানের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও দীর্ঘদিন ধরে দেশে ফিরে নেতৃত্বের আসনে বসার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে আসছিলেন।

তবে, ট্রাম্প শুরু থেকেই ইরানের নতুন নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির বিরোধিতা করে আসছেন এবং দাবি তুলেছেন যে, নেতৃত্ব নির্বাচনে তার (ট্রাম্পের) সরাসরি মতামত থাকতে হবে। এরপর গত ৬ মার্চ তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি জানান।

ট্রাম্প লেখেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি হবে না!’ তিনি আরও যোগ করেন যে, বর্তমান সরকারের পতনের পর দেশ পরিচালনার জন্য ‘মহান ও গ্রহণযোগ্য’ নেতা নির্বাচন করতে হবে।

ওয়াশিংটনের এই পরিবর্তনশীল দাবির বিপরীতে তেহরানের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অনড় ও সুসংগত। কোনো আত্মসমর্পণ নয়, বোমাবর্ষণের মুখে কোনো আলোচনা নয় এবং বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নেতৃত্ব গ্রহণ করা হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া ওয়াশিংটনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার গালে একটি সরাসরি চপেটাঘাত।

অধ্যাপক সেলুম মনে করেন, মোজতবার এই উত্থান এটিই প্রমাণ করে যে— ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এখন দেশটির ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যপূরণের পথে একটি বড় বাধা। ওয়াশিংটন চেয়েছিল সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকার নির্বাচনের সময়টিতে ইরানি প্রশাসনের ভেতরে ফাটল ধরুক এবং তাদের জন্য নতুন কোনো সুযোগ তৈরি হোক। কিন্তু তার বদলে এটি উল্টো সবাইকে এক সুতোয় গেঁথেছে (Rallying effect)।’ 

সেলুম আরও যোগ করেন, “ট্রাম্প মোজতবাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছিলেন, আর ঠিক সেই কারণেই ইরানের নীতিনির্ধারকরা তাকে বেছে নিয়েছেন— কারণ শত্রু তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। যদি ‘শাসন পরিবর্তন’ করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে এই নিয়োগই প্রমাণ করে যে তারা রাজনৈতিকভাবে ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে।”

কুর্দি অভিযান— হবে কি হবে না?

ট্রাম্প প্রশাসনের বিবেচনায় থাকা আরেকটি বিকল্প পরিকল্পনা হলো— ইরানি সামরিক বাহিনীর ওপর কুর্দি যোদ্ধাদের দিয়ে হামলা চালানো, যাতে বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে একটি বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

ইরাকে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে এবং ইরবিলের কাছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও বিদ্যমান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভেতরে কুর্দি যোদ্ধাদের মোতায়েন করা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। 

কুর্দি নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এমন পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে পারে।

অধ্যাপক সেলুম বলেন, ‘ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এমন কোনো সক্ষমতা, ঐক্য বা রসদ নেই যা দিয়ে তারা ইরানে বড় কোনো অভিযান চালাতে পারে। এছাড়া, কুর্দিদের যেকোনো ধরনের সক্রিয়তা তুরস্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ ও সতর্ক করে তুলবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম সংকট সামাল দেওয়ার আগেই দ্বিতীয় আরেকটি সংকটের মুখে পড়বে, যা তাদের জন্য মোটেও কাম্য নয়।’

সম্ভাব্য স্থল অভিযান 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য যেকোনো স্থল অভিযান মোকাবিলার জন্য ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত। 

এদিকে, ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনও এখন পর্যন্ত সরাসরি ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা স্থল সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়নি।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির সিনিয়র ডিরেক্টর কামরান বোখারি মনে করেন, ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ এই পথে বড় বাধা। কারণ, ট্রাম্প যুদ্ধবিরোধী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এছাড়া ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতি এখনও মার্কিন জনমনে ফিকে হয়ে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান পরিচালনা করা প্রেসিডেন্টের জন্য বেশ কঠিন হবে।

কামরান বোখারি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং ইরাক-আফগানিস্তানের ব্যর্থতার কথা বিবেচনা করলে, স্থল সেনা মোতায়েন বা গ্রাউন্ড অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম।’

ইসরায়েলের লক্ষ্য আসলে কী?

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল ইরানকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তবে, কাতার ইউনিভার্সিটির গালফ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মাহজুব জুইরি মনে করেন, বর্তমান যুদ্ধকে ইসরায়েল একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছে। তাদের লক্ষ্য হলো— ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে পুরো অঞ্চলকে নিজেদের মতো করে পুনর্গঠন করা।

তিনি বলেন, “ইসরায়েল মূলত ৭ অক্টোবরের ঘটনাকে একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে— যাকে তারা বলছে ‘মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠন’ (Reshaping the Middle East)। ঠিক যেমনটা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র করেছিল।” 

জুইরি আরও যোগ করেন, ‘ইসরায়েল চায় তাদের চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন প্রতিটি শক্তিকে— তা সে ইরান হোক বা অন্য কেউ, একেবারে নির্মূল, প্রান্তিক অথবা পরাজিত করতে।’

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তবসম্মত পরিণতি কী হতে পারে?

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প ও তার দলের মধ্যে নানা স্ববিরোধী বক্তব্য থাকলেও কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প হলো একটি ‘জোরপূর্বক সমঝোতা’ (Coercive settlement), সরাসরি কোনো স্থল যুদ্ধ নয়।

তিনি আরও বলেন, “ওয়াশিংটন এখনও ইরানি প্রশাসনের কিছু অংশের সঙ্গে, এমনকি আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও একটি গোপন সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ খোলা রাখতে পারে। শর্ত হতে পারে— ইরান যদি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক আচরণের বিষয়ে যথেষ্ট ছাড় দেয়, তবে ট্রাম্প সেটাকে নিজের বড় ‘সাফল্য’ হিসেবে দাবি করে যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন।”

পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের মুস্তাফা হায়দার সৈয়দ মনে করেন, ট্রাম্পের বাস্তববাদী (Pragmatic) মনোভাবই শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারণ করবে।
 
সৈয়দ বলেন, “ট্রাম্প যথেষ্ট বাস্তববাদী একজন মানুষ। তিনি মূলত একটি ‘ডিল’ বা চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইবেন, যাতে তিনি ঘোষণা করতে পারেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং যুদ্ধ শেষ। তিনি বিজয়ের সংজ্ঞা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারেন। তিনি হয়তো বলবেন— খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে, সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করা হয়েছে, আর এভাবেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান মানেই হবে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা এবং আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় বরণ করা।’

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়