শুক্রবার, ২৪শে এপ্রিল ২০২৬, ১০ই বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে হত্যার সময় ব্যবহৃত ধারালো হাসুয়া এবং ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। জমি ভাগ বাটোয়ারার সূত্র ধরেই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকান্ড চালানো হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার এসব তথ্য জানান। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, নিহত হাবিবুর রহমানের ভাগনা সবুজ রানা (২৫), দুলাভাই শহিদুল ইসলাম এবং তার ছেলে শাহিন মন্ডল।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। খবর পাওয়ার পরেই ঘটনাস্থলে পুলিশের একাধিক টিম যায় এবং আলামত সংগ্রহ করে। আমরা একটানা নিবিড় তদন্ত করে এই চার হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হই। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুইজন পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জীবন বন্দী দিয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম পরিচয় বলা হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, নমির উদ্দিনের ৫ মেয়ে এবং এক ছেলে। এর মধ্যে এক ছেলেকে তিনি ১৩ বিঘা জমি লিখে দেন এবং মেয়েদেরকে ১০ কাঠা করে জমি লিখে দেন। এ নিয়ে মেয়েদের এবং জামাইদের মধ্যে মনোমালিন্য ছিল। ২০ এপ্রিল সবুজ এবং নিহত হাবিব ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে যায়। গরু কিনতে না পেরে সন্ধ্যার সময় চলে আসে। তাদের মধ্যে আগে থেকে ক্ষোভ ছিল কীভাবে হাবিবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। হাবিব এবং তার বংশধরদেরকে যদি পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই বোনেরা জমির মালিক হবে এবং নাতিরাই লাভবান হবেন।
এসপি বলেন, সেদিন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে তার নানার বাসায় সবুজ যায়। সবুজ তার মামা হাবিব, মামী পপি এবং তার নানা মিলে সেদিন রাতে একই সঙ্গে রাতের খাবার খায়। সবুজ খাবার খেয়ে বাইরে একটি মাঠে চলে যায়। সেখানে শহিদুল এবং শাহিন ছিল। সেখানে গিয়ে তারা হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা নমিরের কাছ থেকে জমির দলিল নিয়ে আসবে এবং হাবিবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবে। পরিকল্পনা শেষে শাহিন ওই বাড়িতে গিয়ে অবস্থান নেয়। সবুজ তখন তাদেরকে বলে একটু পরে তারা ঘুমায়ে পড়বে তোমরা তখন চলে আসবে। এরপর রাত সাড়ে ১১ টা থেকে ১২ টার দিকে শহিদুল, স্বপন, সবুজ এবং শহিন মিলে হাবিবুরের ঘরে প্রবেশ করে। শাহিন হাবিবের ঘরে প্রবেশ করে বড় ধারালো হাসুয়া দিয়ে হাবিবকে জবাই করে। এরপর একে একে হাবিবের স্ত্রী এবং তার সন্তানদেরকে হত্যা করে।
পুলিশ সুপার বলেন, ওই বাড়িতে প্রবেশের পর নমির উদ্দিনের ঘরে বাইর থেকে ছিটকানি লাগিয়ে দেয়। যেনো নমির উদ্দিন ঘর থেকে বের হতে না পারে। প্রথমে তারা হাবিবকে হত্যা করে এরপর হাবিবের স্ত্রী পপি সুলতানা প্রকৃতির ডাকে বের হলে সবুজ খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখা ধারালো হাসুয়া দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর বাচ্চাদের ঘরে প্রবেশ করে বাচ্চাদেরকেও মেরে ফেলে। তাদের মূল টার্গেট ছিল জমি জমার উত্তরাধিকার। সবুজকেই তার নানা বেশি পছন্দ করতেন। সবুজ এটাও ভেবেছে যে উত্তরাধিকার যদি শেষ করে দিতে পারি তাহলে সে বেশি জমির ভাগিদার হতে পারবে।
তিনি বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। জায়গা জমি নিয়ে তাদের মধ্যে একটি ক্ষোভ ছিল। হত্যার কাজে ব্যবহৃত ধরালো অস্ত্র গুলো শাহিনের বাড়ির কাছে থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আরেকটি ধারালো ছোরা পুকুর উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত পপি সুলতানের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন নিয়ামতপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। বিক্ষুব্ধ জনতা সবুজের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে অধিকত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, এর আগে সোমবার (২০ এপ্রিল) মধ্যরাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহতরা হলেন- উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ (৯) এবং তিন বছরের মেয়ে সাদিয়া আক্তার।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)