শুক্রবার, ১লা মে ২০২৬, ১৭ই বৈশাখ ১৪৩৩


মহিষের দুধের টক দইয়ের অনন্য স্বাদে জমে ওঠে শতবর্ষী ঐতিহ্যের হাট

শেরপুর থেকে

প্রকাশিত:৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৪

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

শেরপুরের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে মহিষের দুধের টক দই। এক সময় আত্মীয়ের বাড়িতে উপহার হিসেবে নেওয়া হতো এই টক দই ও খাঁটি আখের গুড়। এখনও জেলার মানুষের কাছে এটি অন্যতম প্রিয় খাবার। ভাত, চিড়া কিংবা মুড়ির সঙ্গে দই ও খেজুরের গুড় মিশিয়ে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। গরমের দিনে দই, পানি ও চিনি মিশিয়ে তৈরি করা হয় ঘোল। রোজার মাসে ইফতারেও থাকে টক দইয়ের নানা পদ।

আগে জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে কৃষকের ঘরে ঘরে মাটির হাঁড়িতে গরু ও মহিষের দুধ দিয়ে দই পাতার প্রচলন ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন আর সব জায়গায় এই টক দই পাওয়া যায় না। তবুও শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়ারচর এলাকায় এখনো টিকে আছে এই ঐতিহ্য।

ঝগড়ারচর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সপ্তাহে দুই দিন বসে টক দইয়ের ব্যতিক্রমী এক হাট। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ গ্রামীণ বাজার মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় সারি সারি মাটির হাঁড়ি, কাপড় দিয়ে ঢাকা। ক্রেতারা এগিয়ে এলে খুলে যায় ঢাকনা, ভেসে আসে দুধের সুমিষ্ট ঘ্রাণ। হাঁড়িতে জমে থাকা ঘন, সাদা, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মহিষ দুধের টক দই আকর্ষণ করে সবাইকে।

প্রতি সপ্তাহের বুধবার ও শনিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই হাট। জেলার বাইর থেকেও অনেকেই আসেন শুধুমাত্র এই দই কিনতে। প্রতি কেজি দই বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। প্রতি হাটে ১০ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত দই বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এই দই তৈরিতে কোনো কৃত্রিম উপাদান, অতিরিক্ত তাপ বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। মহিষের দুধ সংগ্রহ করে পরিষ্কার মাটির হাঁড়িতে ঢেলে ঢাকনা দিয়ে রেখে দেওয়া হয়। প্রায় তিন দিন পর স্বাভাবিকভাবেই দুধ জমে তৈরি হয় ঘন টক দই। মহিষের দুধের উচ্চ ফ্যাট ও ঘনত্বের কারণেই এটি আলাদা করে জ্বাল দেওয়া বা বীজ মেশানো ছাড়াই জমে যায়।

হাটে আসা শ্রীবরদী উপজেলার শনিরচর গ্রামের আজিজ মিয়া বলেন, মাটির হাঁড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে সামান্য সরিষার তেল মেখে রোদে বা হালকা তাপে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ছেঁকে রাখা তাজা দুধ ঢেলে তিন দিনের মধ্যে দই তৈরি হয়। একেকটি হাঁড়িতে ২ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত দই বসানো যায়। এক কেজি দইয়ের জন্য এক লিটারের কিছু বেশি দুধ লাগে।

তিনি আরও জানান, একটি মহিষ থেকে দিনে তিন থেকে চার লিটার দুধ পাওয়া যায়। অনেক পরিবার দুই দিন দুধ জমিয়ে তৃতীয় দিনে দই বসান এবং পরে তা হাটে নিয়ে বিক্রি করেন।

ঝগড়ারচর গ্রামের দই বিক্রেতা নগর উদ্দিন প্রায় ৩০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তার তিনটি মহিষ রয়েছে। তিনি বলেন, দুই দিনে প্রায় ২৪ কেজি দুধ সংগ্রহ করে দই তৈরি করি। তিন দিন পর সেই দই হাটে এনে বিক্রি করি। এখানে মহিষের দুধ খাওয়ার চল কম, সবাই দই খায়। প্রতি হাটে ১০-১৫ মণ পর্যন্ত দই বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের দই যাচ্ছে।

আরেক বিক্রেতা মো. মিলন মিয়া বলেন, টক দই খেলে গ্যাস্ট্রিক ও হজমের সমস্যা কমে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মিষ্টি দই ভালো না, তাই তারা টক দই খান। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মোবাইলেও অর্ডার আসছে।

জামালপুর সদরের বকুল তলা থেকে আসা ক্রেতা মো. আরিফুর রহমান বলেন, এই বাজারের টক দই খেতে অনেক সুস্বাদু। তাই আমরা নিয়মিত এখান থেকে কিনে নিয়ে যাই।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও টক দইয়ের উপকারিতার কথা বলছেন। জামালপুর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাদিম হাসান বলেন, দই সহজপাচ্য খাবার। এতে প্রোবায়োটিক থাকায় হজম শক্তি বাড়ে। মিষ্টি দইয়ের তুলনায় টক দই স্বাস্থ্যসম্মত, কারণ এতে অতিরিক্ত চিনি থাকে না। আমরা রোগীদের টক দই খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি।

সব মিলিয়ে শেরপুরের মহিষ দুধের টক দই শুধু একটি খাবার নয়, এটি অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেও এই দইয়ের স্বাদ ও জনপ্রিয়তা এখনো অটুট রয়েছে।

 

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়