শুক্রবার, ১লা মে ২০২৬, ১৭ই বৈশাখ ১৪৩৩


কালবৈশাখির তাণ্ডব

৯৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন শেরপুরের অর্ধশতাধিক গ্রাম

শেরপুর থেকে

প্রকাশিত:২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৫৪

শেরপুরে বিদ্যুৎ না পেয়ে দোকানে মোবাইল চার্জ দিচ্ছেন স্থানীয়রা

শেরপুরে বিদ্যুৎ না পেয়ে দোকানে মোবাইল চার্জ দিচ্ছেন স্থানীয়রা

টানা চার দিন ধরে কালবৈশাখি ঝড়, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের প্রভাবে শেরপুর জেলার প্রায় সব উপজেলায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গাছের ডালপালা বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি গ্রামের মানুষ টানা ৭২ থেকে ৯৬ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ এপ্রিল রাত থেকে শুরু হওয়া ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের পর থেকেই বিশেষ করে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকায় টানা ৮০ থেকে ৯৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। এসব এলাকার বেশিরভাগ সংযোগ পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন।

ঝিনাইগাতী উপজেলার নওকুচি, গান্ধিগাঁও, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, কালিবাড়ি, তাওয়াকুচা, দারিয়াপাড়া, কুচনিপাড়া ও হালুহাটি গ্রামসহ বহু এলাকায় তিন থেকে চার দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। একই চিত্র শ্রীবরদী উপজেলার রানিশিমুল, সিংগাবর্ণা ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রাম, কাকিলাকুড়া ও তাঁতিহারি ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশে। অন্যদিকে নালিতাবাড়ী উপজেলার বাতকুচি, খলচন্দা, কাটাবাড়ী, বারোমারী, নন্নী, পাঁচগাঁও ও যোগানিয়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামেও বিদ্যুৎ সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যানদের দেখা মিলছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন দ্রুত মেরামত না হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। এদিকে স্বাভাবিক সময়েও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হয় গ্রাহকদের। তার ওপর ঝড়ের কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলার হালচাটি গ্রামের ওমর ফারুক বলেন, একে বিদ্যুৎ নেই, যার জন্য আমাদের ফসল বাঁচানোই কষ্ট হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে আমরা আমাদের লাইট চার্জ দিতে পারছি না। হাতির জন্য আমাদের ফসল বাঁচানো কষ্ট হয়ে পড়েছে। নেটওয়ার্ক নেই, যার জন্য যোগাযোগ করতে পারছি না। আমাদের যারা এসএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে, তারা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। গত ৯৬ ঘণ্টা যাবৎ আমাদের এখানে বিদ্যুৎ নেই।

শ্রীবরদী উপজেলার বালিঝুড়ি কালিবাড়ি এলাকার কাদির মিয়া বলেন, এমনিতেই আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ থাকে না, তারপর ঝড়ের কারণে গত ৩ দিন থেকে বিদ্যুৎ নেই। কোনো কাজই করতে পারছি না। মোবাইলটা পর্যন্ত চার্জ দিতে পারছি না, এজন্য সব কাজ বন্ধ হয়ে আছে।

শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমন মিয়া বলেন, আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, এজন্য আমরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে।

নালিতাবাড়ী উপজেলার বাতকুচি এলাকার নজরুল মিয়া বলেন, আমরা পাহাড়ি এলাকায় থাকি। আমাদের হাতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই ফসল ফলাতে ও জীবন বাঁচাতে হয়। এদিকে হাতি তাড়ানোর জন্য তেল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার বিদ্যুৎ তো এমনিতেই থাকে না। ঝড়ের কারণে ৪ দিন থেকে বিদ্যুৎ নেই। আমাদের টিকে থাকাটাই খুব কষ্ট হচ্ছে। আমরা বিদ্যুতের সমাধান চাই।

এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের শ্রীবরদী উপজেলার ডিজিএম প্রকৌশলী সূর্য নারায়ণ ভৌমিক বলেন, আমাদের সব এলাকায় মোটামুটি বিদ্যুৎ চালু রয়েছে, তবে কিছু কিছু এলাকায় এখনো চালু হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি। একদিকে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, আমরা ঠিক করছি, আবার ঝড় আসার কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের যে লোকবল রয়েছে, সেগুলো সাধারণ সময়ের জন্য। ইমার্জেন্সি ঝড়-বৃষ্টির জন্য সাপোর্ট দেওয়ার মতো আমাদের তেমন লোক নেই, যার জন্য বিদ্যুতের এ সমস্যাগুলো হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ঝিনাইগাতী উপজেলার সহকারী

জেনারেল ম্যানেজার (ওএন্ডএম) জহুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের সব এলাকায় মোটামুটি বিদ্যুৎ চালু রয়েছে, তবে কিছু কিছু এলাকায় এখনো চালু হয়নি। আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

শেরপুর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. মাইনউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, এটা সত্যি। তবে এটা সামান্য পরিমাণ। শ্রীবরদী উপজেলায় ১৫০০ থেকে ২০০০ বিদ্যুৎ গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে আজ ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত।

প্রায় ৫০টির বেশি গ্রামে বিদ্যুৎ নেই জানালে তিনি বলেন, এত হবে না। ঝিনাইগাতী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাতির জন্য বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ রাখার বিষয় জানানোর জন্য পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ রয়েছে। যে গ্রামে বিদ্যুৎ নেই, সেগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল-আমীন বলেন, বিদ্যুতের বিষয়ে যদি বলি বিভিন্ন জায়গায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ নেই। এ বিষয়ে আমরা পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা কাজ করছে। এছাড়া পাহাড়ে হাতির জন্য বিদ্যুৎ বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে এখনো কথা বলিনি। বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে আমরা পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে কথা বলছি। আশা করি তারা খুব দ্রুতই সমাধান করবে।

শ্রীবরদী উপজেলার নির্বাহী অফিসার মনীষা আহমেদ বলেন, বিদ্যুতের বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএমের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। বিদ্যুতের সমস্যার সমাধানের বিষয়ে তাকে জানানো হচ্ছে। তারা শুধুমাত্র মুখে বলছে যে ঠিক হবে। এসএসসি পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ বন্ধ না করার জন্য আমি তাদেরকে বলেছি, কিন্তু তারা বিদ্যুৎ বন্ধ রেখেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা সমাধানের জন্য কাজ করছি।

উল্লেখ্য, শেরপুর জেলায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায় প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সুবিধা গ্রহণ করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জেলার কৃষি, শিক্ষা ও সাধারণ জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়