মঙ্গলবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ই ফাল্গুন ১৪৩২
ছবি : সংগৃহীত
২০২৬ সালের শুরুতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সূর্যোদয় ঘটেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। কিন্তু নতুন সরকারের সামনে পুষ্পশয্যার বদলে অপেক্ষা করছে এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি এখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি এবং বহুমাত্রিক কূটনীতির জন্য এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এ চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হয়েছে? নাকি এটি বহুমুখী কূটনীতির পথ সংকুচিত করে একমুখী নির্ভরতার দিকে দেশকে ঠেলে দিচ্ছে?
চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে বিদ্যমান সাধারণ গড় শুল্কহার সাড়ে ১৫ শতাংশ। এর ওপর বাড়তি ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে। অর্থাৎ দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে মোট শুল্ক দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩৪ শতাংশ।
প্রশ্ন হলো, একে কি সত্যিই বাণিজ্য সুবিধা বলা যায়? নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, বিপরীতে আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বাণিজ্য ভারসাম্যে বাংলাদেশ এগিয়ে। এই বাস্তবতায় শুল্ক ছাড়ের নামে অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর চাপ বাড়াবে বলেই আশঙ্কা।
চুক্তির অন্যতম আলোচিত দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ‘পাল্টা শুল্ক’ অব্যাহতির কথা। কিন্তু এ সুবিধা নানা শর্তসাপেক্ষ। ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন এসব শর্ত মেনে চলা কতটা বাস্তবসম্মত? বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বহু দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে। কেবল মার্কিন তুলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলে উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ শৃঙ্খলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এর বিপরীতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় বাণিজ্য, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা অঙ্গীকার করতে হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে, ১৫ বছরে ১৫শ’ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি করবে, তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল হিসেবে তুলা কিনবে এবং বছরে প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে। সংখ্যাগুলো বড়সড়; কিন্তু সমস্যা মূলত অঙ্কের নয় নীতির।
যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য আমদানি শুল্ক শূন্য করা, বাধ্যতামূলক পণ্য আমদানি, নিরাপত্তা খাত উন্মুক্ত করা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অন্য দেশের সঙ্গে ব্যবসায় সীমাবদ্ধতা আরোপ, দেশীয় শিল্পে ভর্তুকি বন্ধ চুক্তির প্রায় প্রতিটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য এলে বাংলাদেশ কোনো কোটা আরোপ করতে পারবে না, কোনো পরীক্ষা বা মান নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে না। এটি শুধু বাণিজ্যিক নয়; সার্বভৌম নীতিনির্ধারণের প্রশ্নও। এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও অনিশ্চিত।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর আরোপিত পাল্টা শুল্ক মার্কিন আদালতে বাতিল হওয়ায় ঢাকা-ওয়াশিংটন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্প প্রশাসন বিকল্প আইনের আশ্রয় নিয়ে প্রথমে ১০ শতাংশ, পরে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ নীতিগত স্থিতিশীলতা নেই; বরং রয়েছে নীতির ওঠানামা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় ট্রাম্প লিখেছেন, পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের কৃষক ও শ্রমিক উপকৃত হবে। ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামের এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি এবং বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্য শুল্ক ছাড় পাবে। কিছু পণ্য শুরু থেকেই, আবার কিছু ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত হবে। কিন্তু এতে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে। শুল্ক কমালে আমদানি বাড়বে; ফলে রাজস্ব ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে?
বিষয়টি কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চুক্তির শেষাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনাকাটা সীমিত করবে। যদিও সেই দেশগুলোর নাম উল্লেখ নেই, বাস্তবে বাংলাদেশ সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ কেনে চীন থেকে।
এছাড়া চুক্তির চতুর্থ সেকশনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না। এতে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বহুমুখী কূটনীতির পথ অনুসরণ করেছে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নীতি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলাই ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু নতুন চুক্তি যদি একপাক্ষিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ করে, তবে সেই ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন নতুন বিএনপি সরকার কী করবে? এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না এলেও চুক্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান নতুন সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন। ফলে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে রাজনৈতিক বৈধতা ও জনমতের প্রশ্ন সামনে আসবে।
চুক্তি থেকে সরে আসা সহজ নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা বড় সম্পদ। হঠাৎ প্রত্যাহার কূটনৈতিক সংকেতকে দুর্বল করতে পারে। আবার অন্ধ আনুগত্যও ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং প্রয়োজন পুনর্মূল্যায়ন কোন ধারাগুলো সংশোধনযোগ্য, কোথায় স্পষ্টতা দরকার, কোথায় পারস্পরিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা বেশি। এই খাতের প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ এগিয়ে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে উচ্চ শুল্কভার বহন করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে কৃষি, জ্বালানি ও বিমান খাতে বাধ্যতামূলক আমদানি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াবে।
বিএনপি সরকার ‘দেশ ও জনগণের স্বার্থ আগে’ এই নীতিতে বিশ্বাস করলে এই চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। একটি অস্থায়ী সরকারের নেওয়া এমন দীর্ঘমেয়াদি ও শর্তযুক্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী।
বাংলাদেশকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সচল রাখতে হবে, কিন্তু তা হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে নতুন সরকারকে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখতে হবে। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে আগামীর সফল কূটনীতি। এই বিতর্কিত চুক্তিটি যদি সংশোধন বা পরিমার্জন করা না হয়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্ব দীর্ঘমেয়াদি শিকলে আটকা পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
বহুমুখী কূটনীতি মানে কেবল ভারসাম্য নয়; কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। বাংলাদেশের উচিত হবে চুক্তির সুবিধা-অসুবিধা খোলামেলা আলোচনায় আনা, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের মতামত নেওয়া এবং প্রয়োজনে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসা। যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার কিন্তু একমাত্র নয়। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে টেকসই পথ।
সবশেষে প্রশ্নটি কেবল একটি চুক্তির নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দর্শনের প্রশ্ন। আমরা কি বহুমুখী কৌশল বজায় রেখে বিশ্ববাজারে আত্মবিশ্বাসী অংশীদার হব, নাকি একমুখী নির্ভরতার ফাঁদে পড়ব? সিদ্ধান্ত এখন নতুন সরকারের হাতে। ইতিহাস দেখিয়েছে অর্থনৈতিক চুক্তি শুধু পণ্যের হিসাব নয়; এটি সার্বভৌমত্ব, নীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়বদ্ধতার হিসাবও।
ড. সুজিত কুমার দত্ত : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)