পটুয়াখালী জেলায় এখন তরমুজের মাঠে চলছে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। জেলার প্রায় সব উপজেলাজুড়ে বিস্তীর্ণ মাঠে দেখা মিলছে আগাম জাতের বিভিন্ন আকৃতির তরমুজের। বিভিন্ন ক্ষেতে পরিপক্ব তরমুজ, আবার কোথাও ফল ধরা শুরু করেছে। কোথাও আবার চারাগাছ থেকে ফুটছে হলুদ ফুল। প্রতি মৌসুমের মতো এবারও তরমুজ চাষে নতুন স্বপ্ন বুনছেন এ জেলার চাষিরা।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় তরমুজ উৎপাদন, পরিবহন ও বীজসহ সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। এর মধ্যে শুধু উৎপাদিত তরমুজই বিক্রি হবে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) জেলার বিভিন্ন মাঠ পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেতে আগাম ফলন এসেছে। আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে কৃষকেরা অধিক লাভে এ তরমুজগুলো বিক্রির আশায় রয়েছেন। দেখা যায়, বর্তমানে পেশাদার কৃষকদের পাশাপাশি শিক্ষিত তরুণরাও ঝুঁকছেন এই লাভজনক চাষে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের তরুণ তরমুজ চাষি মো. বেলাল মৃধা জানান, আমি একটা কীটনাশক কোম্পানিতে চাকরি করতাম। কীটনাশক প্রয়োগের নানা পরামর্শের পাশাপাশি আমিও প্রায়ই চাষিদের কাছ থেকে তরমুজ চাষের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নিতাম। এ বছর চাকরি ছেড়ে এসে নিজেই তরমুজের চাষ করছি। অন্যান্য জায়গায় পুরোপুরি তরমুজের ফলন আসতে আরও প্রায় মাসখানেক সময় বাকী কিন্তু আমার গাছগুলাতে তরমুজ এখনই বড় হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ৮-১০ রমজানের দিকেই এগুলা বেঁচতে পারব। এখানে আমি প্রায় ৯ কানি জমিতে তরমুজ চাষ করছি এবং আগাম জাত আছে এর মধ্যে দেড় কানি জমি। প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ করছি। আশা করছি , ১৪-১৫ লাখ টাকার মত বিক্রি করতে পারব।
বেলালের ভাই জাফর মৃধা জানান, ‘হারাদিন আমরা এই ক্ষ্যাতে কাম করছি। এহন এই গাছে সুন্দর সুন্দর তরমুজ দেখে মন খুশিতে ভইরা গ্যাছে। এইগুলা আমরা বেইচ্চা দিমু আর পাশে আরও ২ডা প্রজেক্ট করছি। এহন হারাদিন ওইগুলায় কাম করি। তরমুজ হইছে ভাইগ্যের খেলা। ভাইগ্যে থাকলে মানি আবহাওয়া ভালো থাকলে কোটিপতি হওয়া যায় আর ভাগ্যে না থাকলে সব শেষ।’
আরেক চাষি আফজাল হোসেন বলেন, ‘সিজনাল এ ফল চাষে খুবই ভালো লাগে, লাভজনকও। এইজন্য আমরা ধানের ফলনের পর ডাল মরিচ চাষ না করে বর্তমানে তরমুজ চাষ করি। আমাগো অঞ্চলের তরমুজগুলা বেশি সু-স্বাদু। এগুলার মধ্যে শুধু লাল আর লাল। আমাগো দেখাদেখি আরও অনেকে তরমুজ চাষ করতেছে।’
পটুয়াখালী সদর, গলাচিপা, দশমিনা, বাউফল, রাঙ্গাবালী ও মির্জাগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি চাষ হয় তরমুজের। বর্তমানে তরমুজ উৎপাদনে বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষ জেলা পটুয়াখালী। এখানকার তরমুজ যেমন স্বাদে অতুলনীয়, তেমনি এর আকৃতিও বিশাল। এখানকার একেকটি তরমুজ প্রায় ২০-২২ কেজি ওজনকেও ছাড়িয়ে যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ বছর তরমুজের উৎপাদন, পরিবহন ও বীজের খরচসহ সংশ্লিষ্ট কর্মযজ্ঞকে ঘিরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে পটুয়াখালী জেলায়। এরমধ্যে শুধু উৎপাদিত তরমুজই বিক্রি হবে ২০০ কোটি টাকায়। গত বছর জেলায় ২৭ হাজার ৩ শত ৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হলেও এ বছর আবাদ হচ্ছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪শ ৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হচ্ছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় আরও এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
তরমুজ সাধারণত দোআঁশ মাটি ও বেলে দোআঁশ মাটিতে ভালো জন্মায়। মূলত আবহাওয়ার অনুকূল অবস্থা, নদীবেষ্টিত অঞ্চল হাওয়ায় বছরের প্রায় অর্ধেক সময় ধরে ফসলের মাঠ পানির নিচে তলিয়ে থাকা ও বিভিন্ন জায়গায় নদীর পানির ওঠানামায় মাটির ওপর সৃষ্ট পলির ফলে এখানকার মাটিতে প্রাকৃতিকভাবেই তরমুজের বাম্পার ফলন হয়। এতে খুব কম সার দিয়েও ভালো ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে জোলার স্থানীয়রা বেশিরভাগই মৌসুমী তরমুজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আমানুল ইসলাম বলেন, জেলায় গত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর তরমুজ চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর তরমুজকে ঘিরে জেলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আমরা ধারণা করছি। আমরা চাষিদেরকে বিভিন্ন সময়ে নানা পরামর্শ দিয়ে আসছি। বর্তমানে অতি কুয়াশার কারণে তরমুজের যে পাতা পচা রোগ তা নিরসনেও আমরা কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের স্প্রে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও অতি গরমে যাতে তরমুজ ফেটে না যায় এজন্যও কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। কৃষকদের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কৃষি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উঠান বৈঠকের মাধ্যমে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে মাঠ লেভেলে আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ সবসময় আমাদের তরমুজ দের পাশে আছেন।
সব মিলিয়ে অনুকূল আবহাওয়া ও বাজার পরিস্থিতি ভালো থাকলে চলতি মৌসুমে পটুয়াখালীর তরমুজ চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছাবেন—এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।