47540

02/08/2026 সেনাবাহিনীকে বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি

সেনাবাহিনীকে বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি

আদালত প্রতিবেদক

৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৪১

সেনাবাহিনীতে গুমের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দিতে এ কথা উল্লেখ করেন তিনি।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। ট্রাইব্যুনাল অন্য সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।

এদিন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে সাক্ষীর ডায়াসে ওঠেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। শুরুতেই তাকে শপথ পড়ানো হয়। এরপর নিজের পরিচয় দেন তিনি। ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। পাশাপাশি সেনাপ্রধান থাকাকালীন র‍্যাব নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসেছি। এরপর একে একে বিবরণ দিতে থাকেন ইকবাল করিম।

জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, আমরা যদি ধরে নেই যে, ২০০৮ সাল থেকে সেনাবাহিনীতে খুন শুরু হয়েছে তা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার সংখ্যা ছিল সীমিত। পরবর্তীতে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে ও আইন প্রয়োগ করে সেসব নিয়মিত করা হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে। যেসব কর্তৃপক্ষের নজরে আসায় দোষীদের যথাযথ শান্তি দেওয়া হয়েছে।

ইকবাল করিম বলেন, সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হলো বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়ে সময়ে মোতায়েন করা হয়। এছাড়া দুর্যোগকালীন মুহূর্তেও মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীকে। এমনকি নির্বাচনের সময়েও মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, তখন অধিনায়কদের মনে সার্বক্ষণিক চাপ থাকে তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ তাদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে। তাদের প্রশিক্ষণ 'এক গুলি, এক শত্রু' নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনও যুদ্ধ করতে পারবে না। এজন্য প্রশিক্ষণকালে সেনা সদস্যদের ডি-হিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়। মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনও বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে যখন র‍্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র‍্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না।

সাক্ষ্যে সাবেক এই সেনাপ্রধান আরও বলেন, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। র‍্যাব গঠনের আগে অপারেশন ক্লিন হার্টেও অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে এ সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরবর্তীতে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়। বস্তুত এই দায়মুক্তি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান। অর্থাৎ লাইসেন্স টু কিল।

এদিকে, আজ সকালে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। এ মামলায় তাকেই একমাত্র আসামি করা হয়েছে। গত ১৪ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী
যোগাযোগ: রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল: [email protected], [email protected]