47253

01/29/2026 নির্মাণ কাজে অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায় কার?

নির্মাণ কাজে অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায় কার?

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৯ জানুয়ারী ২০২৬ ১১:০৯

ঢাকার আকাশরেখা বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে, উঠছে বহুতল ভবন, চলছে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে; পাশাপাশি সরকারি–বেসরকারি নানা নির্মাণকাজ।

দৃশ্যমান এই উন্নয়নের আড়ালে প্রতিদিন দিতে হচ্ছে ‘অদৃশ্যমান মূল্য’ তথা অপ্রত্যাশিত ক্ষতি যেমন নির্মাণজনিত ধুলায় বায়ুদূষণজনিত, দিন রাত অসহনীয় শব্দ দূষণজনিত, প্রতিবেশের বাসযোগ্যতায় ক্ষতিজনিত এবং সবচেয়ে ভয়াবহ—শ্রমিক ও পথচারীর প্রাণহানি। এগুলো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এগুলো এমন এক ব্যবস্থাগত দুর্বলতার ফল, যেখানে নিয়মিত তদারকি বা মনিটরিং নেই, সমন্বিত পরিদর্শন নেই, আর দায় নির্ধারণের কার্যকর উদ্যোগ নেই।

দুর্ঘটনার সংখ্যা কেবল সংখ্যা নয়, একটি সতর্ক সংকেত

নির্মাণজনিত কর্মক্ষেত্র-নিরাপত্তা নিয়ে দেশে নিয়মিত যে তথ্য আসে, তা শিউরে ওঠার মতো। বেসরকারি সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির (এসআরএস) এক জরিপ অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত অবস্থায় দুর্ঘটনায় নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছে ১২০ জন। এটি কেবলমাত্র সংখ্যা নয়; এটি আমাদের নিরাপত্তা শাসনব্যবস্থার (safety governance) ঘাটতির সরাসরি প্রতিফলন।

আর পথচারীর মৃত্যু? “উপর থেকে বস্তু পড়ে মৃত্যু”—এটি এখন শহরের নতুন আতঙ্ক। ২০২২ সালে রাজধানীর উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডার চাপায় শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা নির্মাণ অব্যবস্থাপনা ও পথচারী নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতিই প্রকাশ করে।

সাম্প্রতিককালে গুলশানে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে স্টিল রড পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং দায় নির্ধারণে তদন্ত চলছে। এই ধরনের ঘটনা প্রতিবারই একটি প্রশ্ন তুলে দেয়, নির্মাণসাইটে ন্যূনতম পাবলিক সেফটি ব্যবস্থা—ব্যারিকেড, সেফ প্যাসেজ, ওভারহেড প্রোটেকশন, সেফটি নেট—এসব কি সত্যিই বাধ্যতামূলকভাবে মানানো হচ্ছে?

ধুলা-শব্দ: নির্মাণের ‘স্বাভাবিক প্রভাব’ নয়, জনস্বাস্থ্যের বিষয়

নির্মাণকাজ মানেই খনন, কাটিং-গ্রাইন্ডিং, বালি-সিমেন্টের কণা, ট্রাক-ডাম্পারের চলাচল, সারাদিনের উচ্চ শব্দ। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এগুলো শুধু বিরক্তির বিষয় নয়; এগুলো শ্বাসতন্ত্রের রোগ, শিশু-বয়স্কদের ঝুঁকি, ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে PM2.5 দূষণের কারণে ১,৫৯,০০০-এর বেশি অকাল প্রাণহানি হয়েছে এবং স্বাস্থ্য ক্ষতির আর্থিক মূল্য জিডিপি-এর প্রায় ৮.৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের উদ্যোগও আছে। ২০২৫ সালে সরকার শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ জারি করেছে—গেজেটেও এর উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, নির্মাণসাইট-কেন্দ্রিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ, রাতের বেলা কাজের সীমা, উচ্চ ডেসিবেল উৎস নিয়ন্ত্রণ—এসব মাঠপর্যায়ে নিয়মিতভাবে কীভাবে মনিটর হবে, আর ভায়োলেশন হলে কীভাবে দ্রুত ব্যবস্থা হবে?

দায়িত্ব বিভাজনের ফাঁদ: ‘সবাই আংশিক দায়ী, তাই কার্যত কেউ দায়ী নয়’

নির্মাণকাজের নিয়ন্ত্রণে একাধিক সংস্থা জড়িত—এটাই স্বাভাবিক। সমস্যা হয় তখনই, যখন সমন্বয় না থাকে; কর্তৃত্ব-রুটিন-প্রক্রিয়া স্পষ্ট না থাকে।

১। পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE): আইন আছে, কিন্তু নির্মাণসাইটের ধুলা-শব্দ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং, জরিমানা, পুনরাবৃত্তিতে কাজ বন্ধ—এসবের দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক প্রয়োগ সীমিত।

২। সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা: কোথাও কোথাও পানি ছিটানো, অভিযান বা সতর্কতা দেখা যায়; কিন্তু তা অনেক সময় খণ্ড খণ্ড ও অনিয়মিত।

৩। অনুমোদনকারী সংস্থা (রাজউক/অন্যান্য কর্তৃপক্ষ): অনুমোদন ও নকশা-বিধিমালায় নজর আছে, কিন্তু নির্মাণকালীন পরিবেশ-প্রতিবেশ-পাবলিক সেফটি কমপ্লায়েন্সকে ‘নিয়মিত অপারেশন’ হিসেবে বাধ্যতামূলক যাচাই করার প্রক্রিয়া অনুপস্থিত।

৪। শ্রম পরিদর্শন, ফায়ার সার্ভিস, ইউটিলিটি সংস্থা: প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে কাজ করে; কিন্তু একীভূত ‘সাইট কমপ্লায়েন্স কমান্ড’ না থাকায় দায়-জবাবদিহির তাতে তৈরি হয় না।

ফলে যে নির্মাণসাইটে ধুলা উড়ছে, শব্দমাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, আর ফুটপাত দখল করে পথচারীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে—সেখানে কার কাছে, কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় ‘এক দরজায়’ জবাবদিহি নিশ্চিত হবে—তা স্পষ্ট নয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার কারণে নিয়মিত পরিদর্শনও হয় না, লিখিত ইন্সপেকশন রিপোর্টও তৈরি হয় না; আর রিপোর্ট না থাকলে দায় নির্ধারণ, শাস্তি ও বিচার—সবই শেষ পর্যন্ত দুর্বল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি আছে, উদাহরণ আছে; ঘাটতি নীতি ও প্রয়োগে

বিশ্বের বহু দেশে নির্মাণসাইট মানে শুধু কাজ নয়; এটি মানে মনিটর-রেকর্ড-রিপোর্ট-এনফোর্স—এই চক্র। ধুলা (PM2.5/PM10) ও শব্দ (dB) সেন্সর বসিয়ে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট, কতক্ষণ ভায়োলেশন হয়েছে তার ভিত্তিতে ফাইন, পুনরাবৃত্তিতে স্টপ-ওয়ার্ক—এগুলো এখন সাধারণ প্রযুক্তি। বাংলাদেশেও এটি করা সম্ভব। বাধা প্রযুক্তিতে নয়; বাধা হলো—কে বসাবে, কে ডেটা নেবে, কে জরিমানা করবে, কে কাজ বন্ধ করবে—এই কর্তৃত্ব ও প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি।

করণীয়: একটি ‘কমপ্লায়েন্স’ এখনই দরকার

কয়েকটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব, যা বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে:

১. সমন্বিত ‘নির্মাণ নিরাপত্তা ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স সেল’ গঠন;

পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE), সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা, শ্রম পরিদর্শন, ফায়ার সার্ভিস, সংশ্লিষ্ট ইউটিলিটি সংস্থা (গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ) এবং ট্রাফিক/পুলিশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমপ্লায়েন্স সেল গঠন করা প্রয়োজন। এই সেলের দায়িত্ব হবে উচ্চঝুঁকির নির্মাণসাইটগুলোয় নিয়মিত যৌথ পরিদর্শন করা, ত্রুটি শনাক্ত করে নির্দেশনা দেওয়া এবং গুরুতর ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা।

২. পারমিটের শর্ত হিসেবে ‘নির্মাণকালীন পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ বাধ্যতামূলক করা;

নির্মাণ অনুমোদন কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ডেভেলপার/ঠিকাদারকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘নির্মাণকালীন পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ জমা দিতে হবে। এতে ধুলা নিয়ন্ত্রণ (স্টকপাইল কভারিং, পানি স্প্রে, ট্রাক কভার, হুইল ওয়াশ), শব্দ নিয়ন্ত্রণ (কাজের সময়সীমা, নয়েজ ব্যারিয়ার), পাবলিক সেফটি (ব্যারিকেডিং, সেফ প্যাসেজ, ওভারহেড প্রোটেকশন/সেফটি নেট) এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা (Emergency Response Plan) স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ‘নির্মাণকালীন পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ অনুমোদিত না হলে নির্মাণ পারমিট কার্যকর হবে না এমন শর্ত প্রণয়ন জরুরি।

৩. বড় প্রকল্পে রিয়েল-টাইম PM ও dB মনিটরিং বাধ্যতামূলক করা;

প্রথম ধাপে বড় সরকারি প্রকল্প, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা এবং স্কুল-হাসপাতাল সংলগ্ন সংবেদনশীল জোনে PM (PM2.5/PM10) ও শব্দমাত্রা (dB) পরিমাপের সেন্সর স্থাপন করে ড্যাশবোর্ড-ভিত্তিক মনিটরিং ও স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ভায়োলেশন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি স্থায়ী হলে তাৎক্ষণিক জরিমানা এবং একই ধরনের ভায়োলেশন পুনরাবৃত্ত হলে কাজ সাময়িক বন্ধ (স্টপ-ওয়ার্ক অর্ডার) দেওয়ার বিধান কার্যকর করতে হবে।

৪. মাসিক ইন্সপেকশন রিপোর্ট প্রকাশ নিশ্চিত করা;

প্রতিটি উচ্চঝুঁকির নির্মাণসাইটে মাসিক ভিত্তিতে ইন্সপেকশন রিপোর্ট প্রস্তুত ও প্রকাশ করা প্রয়োজন—যেখানে উল্লেখ থাকবে, কোন কোন ব্যত্যয় শনাক্ত হয়েছে, কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং কত দিনের মধ্যে সংশোধন করতে হবে। এতে আতঙ্ক নয়; বরং স্বচ্ছতা ও নিয়ম মানার সংস্কৃতি তৈরি হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ওপর বাস্তব জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।

৫. একীভূত অভিযোগব্যবস্থা (হটলাইন/অ্যাপ) ও ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা;

সাধারণ মানুষ যেন সহজে জানে কোথায় অভিযোগ করবে-সে জন্য একটি কেন্দ্রীয় হটলাইন/অ্যাপ চালু করা দরকার। অভিযোগ গ্রহণের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ট্র্যাকিং নম্বর প্রদান, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পরিদর্শন সম্পন্ন করা এবং অভিযোগকারীকে ফলাফল জানানো—এসব বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।

শেষ কথা: উন্নয়ন চাই, কিন্তু জীবন ও প্রতিবেশ রক্ষার শর্তে

উন্নয়ন থেমে থাকবে না, তা উচিতও নয়। কিন্তু উন্নয়নের মূল্য যদি হয় ধুলা, শব্দ, অনিরাপদ সাইট, আর অবহেলাজনিত মৃত্যু, তবে সেটি উন্নয়ন নয়; পরিকল্পনাহীনতার আত্মঘাতী দায় মেনে নেওয়ার নামান্তর। আজ প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহের সমন্বিত নজরদারি, বাধ্যতামূলক ইন্সপেকশন রিপোর্ট, প্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিং এবং দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক এনফোর্সমেন্ট। নির্মাণ হবে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও প্রতিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, এই অবহেলা জনিত হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার দায়হীনভাব আর নয়।

ইকবাল হাবিব : স্থপতি, সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (এসএএফ) সহ-সভাপতি

সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী
যোগাযোগ: রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল: [email protected], [email protected]