47182

01/27/2026 তামাকে ৪০ হাজার কোটির রাজস্ব হলেও ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি

তামাকে ৪০ হাজার কোটির রাজস্ব হলেও ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১৩:৫৪

তামাক খাত থেকে সরকার বছরে যেখানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে, সেখানে তামাকজনিত রোগে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অকাল মৃত্যুর কারণে দেশের ক্ষতি হচ্ছে তার দ্বিগুণেরও বেশি– প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।

এই বাস্তবতা সামনে রেখে তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান ও সদ্য জারি করা সংশোধন অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ-২০২৫ এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসি) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

অতিরিক্ত সচিব বলেন, তামাক থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও অকাল মৃত্যুর কারণে দেশের ক্ষতি হচ্ছে ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ‘এই ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক নয়। এটি পরিবার ভেঙে যাওয়ার, মানুষের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাওয়ার ক্ষতি,’ বলেন তিনি।

শেখ মোমেনা মনি বলেন, যদি প্রতিদিন এত মানুষের মৃত্যু কোনো বিমান দুর্ঘটনায় হতো, তাহলে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হতো। কিন্তু তামাকের মৃত্যু নীরব, ধীরে আসে। আমরা সেটার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার গত ৩০ ডিসেম্বর ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ জারি করেছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, এটি শুধু একটি আইন নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের পক্ষে সরকারের দৃঢ় ও নীতিগত অবস্থান।

সংশোধন অধ্যাদেশের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অতিরিক্ত সচিব বলেন, পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে তামাক বিক্রি করা যাবে না। সিনেমা, নাটক, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামাক ব্যবহারের দৃশ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দোকানে তামাকের রঙিন প্যাকেট ঝুলিয়ে রাখাও বন্ধ করা হয়েছে।

পাশাপাশি তরুণদের লক্ষ্য করে বাজারজাত করা ই-সিগারেট ও ভ্যাপ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, এসব পণ্য তরুণদের বিভ্রান্ত করে নেশার পথে ঠেলে দিচ্ছে।

আইনের সফলতা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে উল্লেখ করে শেখ মোমেনা মনি বলেন, আইন যেন কাগজে শক্ত হয়ে না থাকে, বাস্তবে কাজ করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের বাস্তবায়নের দায় নিতে হবে, প্রশাসনকে চোখ বন্ধ রাখা যাবে না, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকে চাপ তৈরি করতে হবে।

তিনি জানান, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৫৬৪ জন মানুষ তামাকজনিত কারণে মারা যাচ্ছেন। ‘তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতের জন্য একজনকেও যদি বাঁচানো যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য,’ বলেন তিনি।

ভয় দেখিয়ে নয়, সচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমেই তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব– এমন মন্তব্য করে অতিরিক্ত সচিব বলেন, মোবাইল কোর্ট দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মানুষ নিজে থেকে ‘না’ বললেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।

শেখ মোমেনা মনি জানান, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বর্তমানে ৩৪টি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করছে। স্কুলে ধূমপান নিষিদ্ধ, শিক্ষক নিয়োগে ধূমপায়ীদের অযোগ্য ঘোষণা, পাঠ্যবইয়ে তামাকবিরোধী বিষয় অন্তর্ভুক্তি, তামাক চাষে নিরুৎসাহিতকরণ এবং রেলওয়েকে ধূমপানমুক্ত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

যুবসমাজকে লক্ষ্য করে তামাক কোম্পানির আগ্রাসনের বিষয়েও সতর্ক করেন অতিরিক্ত সচিব। তিনি বলেন, কনসার্টে বিনামূল্যে সিগারেট বিতরণ বা গ্ল্যামারের মোড়কে নেশা ছড়ানোর বিরুদ্ধে নীরব থাকা যাবে না।

মতবিনিময় সভায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সদ্য প্রণীত এ অধ্যাদেশটির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সুচিন্তিত মতামত ও সুপারিশ আহ্বান করা হয়।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান।

সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী
যোগাযোগ: রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল: [email protected], [email protected]