‘গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ দ্রুততম সময়ে ফিরে আসবে’
প্রকাশিত:
১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ২০:৩৫
আপডেট:
১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ২২:৪০
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেছেন, ‘দেশে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া ও গণভোট যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হয়, তবে ফ্যাসিবাদ দ্রুততম সময়ে ফিরে আসবে। কারণ একবার কোনো পথ কেউ চিনে গেলে দ্বিতীয়বার সেখানে যেতে সময় অনেক কম লাগে।’
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশে বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
মনির হায়দার বলেন, ‘গণভোটের মধ্য দিয়ে কতটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও মূলত একটি প্রশ্নেরই নিষ্পত্তি হবে, তা হলো- আমরা কি ফ্যাসিবাদ আবার চাই, নাকি চাই না? জাস্ট এটা নিষ্পত্তি হবে।’
তিনি বলেন, ‘অনেকে বলছেন চারটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হবে। মূলত জুলাই জাতীয় সনদে ৮৪টি সুপারিশ আছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত, যা বাস্তবায়ন আদেশে চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। পরিসংখ্যানগত দিক দিয়ে সব সংখ্যা সঠিক হলেও গণভোটে মূলত একটি মৌলিক প্রশ্নেরই ফয়সালা হবে। সেটি হলো, ফ্যাসিবাদ ফিরবে কি না।’
মনির হায়দার বলেন, ‘কোনো কারণে যদি এই গণভোট ব্যর্থ হয়, তাহলে কী হবে? এর উত্তর খুব সিম্পল। ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে, আসবেই এবং দ্রুততম সময়ে আসবে। বাংলাদেশে প্রথমবার ফ্যাসিবাদ আসতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু বাই দিস টাইম ফ্যাসিবাদ রাস্তাঘাট সব চিনে গেছে। তাই পরেরবার আসতে তারা সময় নেবে না।’
তিনি বলেন, ‘কারও কারও হয়তো পরাজিত ফ্যাসিবাদের প্রতি অনুরাগ থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের উত্তর প্রজন্মের কথা চিন্তা করে তাদের কোথায় রেখে যাবো? আমরা কি চাইব আমাদের সন্তান কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করে জীবন কাটাক? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ রেখে যাবো, যেখানে আইনের শাসন ও মানুষের মর্যাদা থাকবে? উন্নত বিশ্বের মতো আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে সিস্টেম সবাইকে রক্ষা করবে?’
আসন্ন গণভোট ও সংস্কার নিয়ে অপপ্রচার চলছে উল্লেখ করে মনির হায়দার বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, তার বিরুদ্ধে ভয়াবহ মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চলছে। বলা হচ্ছে, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে এটা থাকবে না, ওটা থাকবে না। এগুলো নির্জলা মিথ্যা। আজকের এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রচার নয়, বরং মানুষের কাছে সঠিক তথ্যটা পৌঁছে দেওয়া। আপনারা যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন, তাদের এই বিভ্রান্তি দূর করতে হবে।’
জুলাই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত অভ্যুত্থানে বহু বাবা-মায়ের আদরের সন্তান, কিশোর ও তরুণরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অকাতরে জীবন দিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে হয়তো এখানে উপস্থিত কারও সন্তান জীবন দেয়নি। কিন্তু যারা প্রাণ দিয়েছে, তারা আমাদেরই মতো বাবা-মায়ের সন্তান। বাংলাদেশে যদি আবারও কোনোদিন ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে, তবে তখন হয়তো আমাদের সন্তানদেরই জীবন দিতে হবে। পরের ফ্যাসিবাদ আমাদের জন্য নিরাপদ হবে, এমনটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। কারণ, অস্বাভাবিক পথ কখনো ভালো কিছু বয়ে আনে না। আমরা দেখেছি, গত আন্দোলনে পুলিশ কর্মকর্তা ও সিভিল সার্ভেন্টদের পরিবারের সদস্যরাও জীবন দিয়েছেন, অনেকে জেল খেটেছেন।’
মনির হায়দার বলেন, ‘৫৪ বছর পর জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে যে, গত ৫৪ বছর ধরে আমরা যে ব্যবস্থা চর্চা করে আসছি, তা পাল্টানো দরকার। এই পুরনো ব্যবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা পুরনো ব্যবস্থা থেকে বের হবো ঠিকই, কিন্তু একটি পুরনো স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও সত্য হলো, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই স্বপ্নই বাস্তবায়ন করতে চাই, যারা ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে এই দেশ তৈরি করেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে তিনটি মূলনীতি ছিল। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার বা ইনসাফ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে এগুলো রাষ্ট্রীয় জীবনের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি, বরং ট্রেনটি শুরুতেই ভুল ট্র্যাকে চলে গিয়েছিল। আমরা রাষ্ট্রকে আবার সেই সঠিক ট্র্যাকে, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারে ফিরিয়ে আনতে চাই। যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষের মর্যাদা ও ইনসাফ নিশ্চিত থাকবে।’
সভায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: