শনিবার, ১৭ই জানুয়ারী ২০২৬, ৩রা মাঘ ১৪৩২


ইসলামিক ন্যাটো থেকে অস্ত্র চুক্তি: আরব বিশ্বে প্রভাব বাড়ছে পাকিস্তানের


প্রকাশিত:
১৬ জানুয়ারী ২০২৬ ১৭:৫৬

আপডেট:
১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ০২:২২

ছবি-সংগৃহীত

চীনের সহযোগীতার ওপর ভর করে পাকিস্তান ধীরে ধীরে আরব বিশ্ব জুড়ে তার সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রভাব বৃদ্ধি করছে, যা দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ায়— বিশেষ করে ভারতের জন্য ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে।

একদিকে ইসলামাবাদ যখন সৌদি আরব এবং সুদানের সঙ্গে বহু বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে, তখন দেশটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো-সদৃশ ইসলামিক জোটের জন্য সৌদি আরব এবং তুরস্কের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া তৈরি করেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন মন্ত্রী।

ইসলামিক ন্যাটো
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন মন্ত্রী রাজা হায়াত হাররাজ সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তিটি গত বছর ঘোষিত দ্বিপাক্ষিক সৌদি-পাকিস্তান চুক্তি থেকে আলাদা। তিনি বলেন, চুক্তিটি সম্পন্ন করার জন্য তিনটি দেশের মধ্যে চূড়ান্ত ঐকমত্য প্রয়োজন।

হাররাজ বলেন, ‘পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্ক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এমন একটি বিষয় যা অনেক আগে থেকেই বিবেচনাধীন ছিল। খসড়া চুক্তিটি ইতিমধ্যেই সৌদি আরব ও তুরস্কের কাছে কাছে পাঠানো হয়েছে এবং তিনটি দেশই এ নিয়ে গত ১০ মাস ধরে আলোচনা করছে।’

প্রতিরক্ষা চুক্তি
এদিকে চলতি মাসের শুরুতে রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান সুদানে অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান সরবরাহের জন্য ১.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা সুদানের আধাসামরিক র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) বিরুদ্ধে লড়াইরত সুদানী সেনাবাহিনীর জন্য একটি বড় ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়।

এছাড়াও গত বছর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক মাস পর, পাকিস্তানকে দেওয়া সৌদি আরবের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণকে অত্যাধুনিক জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তর করার জন্য রিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করছে ইসলামাবাদ।

বৃহৎ প্রতিরক্ষা চুক্তির মানদণ্ড অনুসারে, ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সুদানী চুক্তি এবং ২ বিলিয়ন ডলারের সৌদি চুক্তি বিশাল ‍কিছু নয়। তবে আলোচনার অধীনে থাকা চুক্তিগুলো পাকিস্তানি সামরিক সরঞ্জামের ক্রমবর্ধমান পদচিহ্ন এবং আরব বিশ্বে পাকিস্তানের প্রভাব প্রদর্শন করে।

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুসারে, সৌদি আরব ছাড়াও বাংলাদেশ, ইরাক, মিয়ানমার, আজারবাইজান ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে - যা পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স এবং চীনের চেংডু এয়ারক্রাফ্ট কর্পোরেশনের যৌথভাবে নির্মিত।

পাকিস্তানের পরিবর্তনশীল ভূমিকা
এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে পাকিস্তানের অস্ত্র ও বিমান বিক্রির ঘটনা এটিই প্রথম নয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামাবাদের সামরিক ভূমিকা ঐতিহ্যগতভাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আরব মিত্রদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু চলমান আলোচনা যদি সফল হয়, তাহলে এটি কিছু ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র রফতানিকারকে পরিণত করতে পারে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে যোকোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা প্রদান করতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ইসলামাবাদকে সাবধানতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং বিভক্ত আরব বিশ্বে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, নতুবা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সেতুবন্ধনের ঝুঁকি নিতে হবে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তান যুদ্ধবিমান এবং অস্ত্র বিক্রি করছে সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে, যাদের প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন রয়েছে। অপরদিকে সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) সংযুক্ত আরব আমিরাত অর্থায়ন করে বলে অভিযোগ রয়েছে– যদিও এই অভিযোগ আবুধাবি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।

লিবিয়ায় বিদ্রোহী নেতা খলিফা হাফতারের সঙ্গে পাকিস্তানের ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে বলে জানা গেছে, হাফতারের মিলিশিয়া গোষ্ঠীটি বর্তমানে দেশটির উত্তরের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আবার হাফতারকে সুদানের আরএসএফকে সাহায্য করার জন্য অভিযুক্ত করেছে সুদানি সেনাবাহিনী।

এদিকে, ইয়েমেনে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আবুধাবি অস্ত্র সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ করেছে রিয়াদ। তবে আরব আমিরাত এই অভিযোগও অস্বীকার করেছে।

রিয়াদ-ভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের সহযোগী ফেলো উমর করিম আল জাজিরাকে বলেন, ‘এই পটভূমিতে, পাকিস্তানের পক্ষে বিরোধী পক্ষের কাছে একই অস্ত্র ব্যবস্থা বিক্রি করা সহজ হবে না’।

চীন ফ্যাক্টর
পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা সুলতান আল জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তানি অস্ত্র, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭, সুদানের সেনাবাহিনী এবং লিবিয়ার বিদ্রোহীদের জন্য অতিরিক্ত ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব প্রদান করে। এই দেশগুলো তাদের প্রয়োজন অনুসারে (বড় দেশগুলোর তুলনায়) কম সংখ্যক বিমান কিনতে পারে, তবে চীনের শক্তিশালী সমর্থনের কারণে পাকিস্তানকে তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্রের উৎস হিসাবে বিবেচনা করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটাও লক্ষণীয় যে, বিশ্বে অনেক দেশ প্রতিরক্ষা ক্রয় কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করার সাথে সাথে, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার পটভূমিতে সম্ভাব্য অস্ত্র ক্রেতাদের সঙ্গে ইসলামাবাদের আলোচনা চলছে।’

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী অস্ত্রের বাজারে ৪৩ শতাংশ দখল করে বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারক দেশ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে চীন, বিশ্বব্যাপী অস্ত্রের চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ যোগান দেয় দেশটি- যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানে যায়।


সম্পর্কিত বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:




রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected]; [email protected]
সম্পাদক : লিটন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top